default-image

২৭ মার্চ সকালে তিন ঘণ্টার জন্য সান্ধ্য আইন তুলে নেওয়া হয়। এর সঙ্গে সঙ্গে অসংখ্য ভীতসন্ত্রস্ত মানুষ রাস্তায় নেমে পড়ে। বেশির ভাগ মানুষ বের হয় শহর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য। কাতারে কাতারে মানুষ যেতে থাকে গ্রামের দিকে। শহরের অনেক রাস্তার পাশে পড়ে ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহতদের লাশ। মানুষ বুঝতে পারে, কী বিভীষিকা শহরে ঘটে গেছে।

সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম বেতারকেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান বীর উত্তম (পরে লেফটেন্যান্ট জেনারেল, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি এবং বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা) ইংরেজিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন।

চট্টগ্রামের কালুরঘাট কেন্দ্র থেকে ২৬ মার্চের মতো এই দিন দ্বিতীয়বারের মতো স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে। অনুষ্ঠানে দুবার স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন জিয়াউর রহমান। প্রথমবার তিনি নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধান পরিচয় দিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করেন। পরে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের পরামর্শে ঘোষণাটি দ্বিতীয়বার পাঠ করেন বঙ্গবন্ধুর নামে।

জিয়াউর রহমান ২৭ মার্চ প্রথমবার স্বাধীনতার যে ঘোষণা পাঠ করেছিলেন, তার মূল কপিটি নষ্ট করে ফেলা হয়েছিল। দ্বিতীয়বার বঙ্গবন্ধুর নামে যে স্বাধীনতার ঘোষণাটি পাঠ তিনি করেন, সেটি বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: দলিলপত্র-এর তৃতীয় খণ্ডে সংরক্ষণ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বিশ্ব গণমাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষণা

২৫ মার্চ রাতের ঢাকার পরিস্থিতি এবং বঙ্গবন্ধুকে আটকের ঘটনা ২৭ মার্চেই বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশের পত্রিকা, সংবাদ সংস্থা ও সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হয়।

বিবিসির খবরে বলা হয়, ‘কলকাতা থেকে সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠানের খবরে প্রকাশ যে পূর্ব পাকিস্তানের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এক গুপ্ত বেতার থেকে জনসাধারণের কাছে প্রতিরোধের ডাক দিয়েছেন।’

ভয়েস অব আমেরিকার খবরে বলা হয়, ‘ঢাকায় পাকিস্তান বাহিনী আক্রমণ শুরু করেছে। মুজিবুর রহমান একটি বার্তা পাঠিয়েছেন এবং সারা বিশ্বের নিকট সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন।’

দিল্লির দ্য স্টেটসম্যান-এর খবর ছিল, ‘বাংলাদেশ স্বাধীনতা ঘোষণা করেছে, সামরিক অভিযানের প্রতিবাদে (শেখ মুজিবুর) রহমানের পদক্ষেপ। একটি গোপন বেতার থেকে প্রচারিত ভাষণে শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের পূর্বাংশকে স্বাধীন বাংলাদেশ হিসেবে নতুন নামকরণ করেছেন।’

যুক্তরাজ্যের দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ ‘সিভিল ওয়ার ফ্লেয়ারস ইন ইস্ট পাকিস্তান: শেখ এ ট্রেইটর, সেইজ প্রেসিডেন্ট’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদে বঙ্গবন্ধুর পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা এবং ইয়াহিয়া খানের বেতার ভাষণে শেখ মুজিবকে তাঁর বিশ্বাসঘাতক বলার কথা উল্লেখ করা হয়।

যুক্তরাজ্যের আরেক পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ান-এ বলা হয়, ‘২৬ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জাতির উদ্দেশে রেডিওতে ভাষণ দেওয়ার পরপরই দ্য ভয়েস অব বাংলাদেশ নামে একটি গোপন বেতারকেন্দ্র থেকে শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়েছে। তাঁর এই ঘোষণা অন্য একজন পড়ে শোনান।’

নিউইয়র্ক টাইমস-এ বঙ্গবন্ধু ও ইয়াহিয়ার ছবি ছাপানো হয়। পাশে লেখা হয় ‘স্বাধীনতা ঘোষণার পরই শেখ মুজিব আটক’।

বার্তা সংস্থা এপির খবর ছিল, ‘ইয়াহিয়া খান আবার সামরিক শাসন জারি করার এবং আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার পর পূর্ব পাকিস্তানে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে।’

এর বাইরেও ভারতের আরও কয়েকটি পত্রিকা এবং আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, কানাডা, দক্ষিণ আফ্রিকা, জাপান, হংকং, নরওয়ে, তুরস্ক, সিঙ্গাপুরসহ বহু দেশের খবরে স্থান পায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার খবর। আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেস হেরাল্ড-এর একটি খবরের শিরোনাম ছিল, ‘বেঙ্গলি ইনডিপেনডেন্স ডিক্লেয়ার্ড বাই মুজিব।’

ভারতের প্রতিক্রিয়া

২৭ মার্চ ভারতের রাজ্যসভা ও লোকসভার যৌথ অধিবেশনে বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। এতে দেশটির প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী অংশ নেন।

বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে লোকসভায় নেওয়া প্রস্তাবে বলা হয়:

১. পূর্ব বাংলার সাম্প্রতিক ঘটনাবলিতে নিদারুণ মনঃকষ্ট ও গভীর উদ্বেগ জানাচ্ছে এই আইনসভা। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পাঠানো সশস্ত্র বাহিনী পূর্ব বাংলার জনগণের ওপর প্রচণ্ড হামলা চালিয়েছে এবং এই হামলা চালানোর উদ্দেশ্য হলো তাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও অভিলাষ দমন করা।

২. পাকিস্তানে ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে জনগণের ইচ্ছার যে নির্ভুল প্রতিফলন ঘটেছে, সেটিকে শ্রদ্ধা করার বদলে পাকিস্তানের সরকার জনগণের ম্যান্ডেটকে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে উড়িয়ে দেওয়ার পথ বেছে নিয়েছে।

৩. পাকিস্তানের সরকার শুধু যে বৈধভাবে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছে, তা নয়, বরং বিতর্কিতভাবে জাতীয় গণপরিষদের ন্যায্য ও সার্বভৌম ভূমিকা পালনের ক্ষেত্রে বাধা দিয়েছে। পূর্ব বাংলার জনগণকে দমনের জন্য বলপ্রয়োগের নগ্ন দৃষ্টান্ত প্রদর্শন করা হয়েছে।

৪. ভারতের জনগণ ও সরকার সব সময় পাকিস্তানের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ, স্বাভাবিক ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী এবং এ লক্ষ্যে কাজ করে যেতে চায়। অন্যদিকে উপমহাদেশের জনগণের সঙ্গে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের শতাব্দীপ্রাচীন বন্ধন রক্ষা করতে ভারত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সীমান্তের সন্নিকটে ঘটে যাওয়া এমন ভয়ংকর বিয়োগান্ত ঘটনায় এই আইনসভার পক্ষে উদাসীন থাকা সম্ভব নয়। নিরস্ত্র ও নিরীহ মানুষের ওপর চলা অভাবিত মাত্রার এমন হিংসাত্মক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে পুরো দেশের জনতা নিন্দা জানিয়েছে।

৫. গণতান্ত্রিক পথ বেছে নেওয়া পূর্ব বাংলার জনগণের প্রতি আইনসভা গভীর সহানুভূতি ও সংহতি প্রকাশ করছে।

৬. আইনসভা প্রতিরক্ষাহীন মানুষের ওপর বলপ্রয়োগ ও নৃশংসতা অবিলম্বে বন্ধ করার দাবি জানাচ্ছে এবং বিশ্বের সব মানুষ ও সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছে যেন গণহত্যার শামিল হত্যাযজ্ঞ বন্ধে পাকিস্তান সরকারের ওপর জরুরি ও গঠনমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

৭. এই আইনসভা বিশ্বাস করে, পূর্ব বাংলার মানুষের এই ঐতিহাসিক উত্থান বিজয়ে রূপ নেবে। তাদের সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের প্রতি ভারতের জনগণের আন্তরিক সহানুভূতি ও সমর্থন রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বিদেশি সাংবাদিকদের বহিষ্কার

সংবাদ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ঢাকায় আসা প্রায় ৫০ জন বিদেশি সাংবাদিক ২৫ মার্চ রাতে ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে আটক ছিলেন। ২৭ মার্চ কড়া সেনা পাহারায় তাঁদের হোটেল থেকে সরাসরি বিমানবন্দরে নিয়ে বিশেষ বিমানে করাচি পাঠানো হয়।

পরে জানা যায়, তখন দুজন সাংবাদিক পাকিস্তানি সেনাদের চোখ এড়িয়ে হোটেলে লুকিয়ে ছিলেন। তাঁদের একজন ছিলেন সাইমন ড্রিং। কারফিউ শিথিল হলে তাঁরা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ প্রত্যক্ষ করতে সক্ষম হন। পরে তাদের পাঠানো প্রতিবেদন বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে।

চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহ

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় শাফায়াত জামিল বীর বিক্রম (স্বাধীনতার পর কর্নেল) চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙালি সেনা-কর্মকর্তা ও সেনাদের নিয়ে বিদ্রোহ করেন। রেজিমেন্টের পাকিস্তানি ও অবাঙালি সদস্যদের বন্দী করা হয়। পরে তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন রেজিমেন্টের উপ-অধিনায়ক মেজর খালেদ মোশাররফ বীর উত্তম (পরে মেজর জেনারেল)। তিনি এই রেজিমেন্টের নিয়ন্ত্রণ হাতে নেন।

ঠাকুরগাঁওয়ে ইপিআর শাখার বাঙালি সেনারা রাতে বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। চট্টগ্রাম শহরের চারদিকে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিক্ষিপ্ত লড়াই চলে। কুমিরায় তুমুল যুদ্ধ হয়। দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাঙালিরা পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বিক্ষিপ্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: দলিলপত্র, তৃতীয় ও দ্বাদশ খণ্ড; বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা-ফ্যাক্টস অ্যান্ড উইটনেস: আ ফ ম সাঈদ; একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, রক্তাক্ত মধ্য-আগস্ট ও ষড়যন্ত্রময় নভেম্বর: শাফায়াত জামিল; লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে: রফিকুল ইসলাম।

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান