default-image

সদ্য ভারত এবং পশ্চিম ও পূর্ব পাকিস্তান সফর করে যাওয়া ব্রিটেনের সংসদীয় প্রতিনিধিদলের নেতা আর্থার বটমলি ১৪ জুলাই বিবিসির অনুষ্ঠান আউটলুকে বলেন, তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাঁকে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, তাঁর এই অনুরোধের প্রতিক্রিয়া হয়েছিল ভয়ানক। পাকিস্তানের সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান এতে খুবই উত্তেজিত হয়ে গিয়েছিলেন। ইয়াহিয়া তাঁর কাছে শেখ মুজিবকে অপরাধী বলে বর্ণনা করেন।

বিবিসির প্রচারিত সংবাদে এদিন বলা হয়, ব্রিটেনের এই সংসদীয় প্রতিনিধিদলের সদস্য রেজিল্যান্ড প্রেন্টিস তাদের বলেছেন, পূর্ব
পাকিস্তানের মানুষের সঙ্গে কথাবার্তা বলে তিনি এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে কয় মাস ধরে সেখানে অবাধ সন্ত্রাসের রাজত্ব চলছে। তিনি বলেন, পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যার সমাধান করতে পারবেন শুধু নির্বাচিত প্রতিনিধিরা, এককথায় বললে শেখ মুজিবুর রহমান।

যুক্তরাজ্যের কূটনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল থেকে এ অভিমত জানানো হয় যে পাকিস্তানের প্রতিবাদে ব্রিটিশ সরকার খুবই অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্রিটিশ সরকার তাদের গৃহীত নীতিকে সঠিক বলেই মনে করছে। ব্রিটিশ সরকার আরও মনে করে, বাংলাদেশের জনসাধারণের সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের কোনো যোগাযোগ নেই। কোনো দমনমূলক নীতিই তাদের সম্পর্ককে ফিরিয়ে আনতে পারবে না।

বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের নিকট প্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি রজার পি ডেভিস ১৪ জুলাই সিনেটে জানান, পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধ পরিস্থিতির দরুন সাহায্য কর্মসূচিতে কঠিন সব সমস্যা দেখা দিয়েছে। শৃঙ্খলা ফিরিয়ে না আনা অবধি উন্নয়নের জন্য সাহায্য দেওয়া যায় না।

নিউইয়র্ক টাইমস এদিন পাকিস্তানকে জাহাজে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে যেতে দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সরকারের কঠোর সমালোচনা করে। পত্রিকাটি বলে, পাকিস্তানের সামরিক জান্তা পূর্ব পাকিস্তানে যে উৎপীড়ন চালাচ্ছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তানকে আরও অস্ত্র দেওয়াটাই অমার্জনীয় কাজ।

ড. মালিক প্রেসিডেন্টের মূল ব্যক্তি

পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এক ঘোষণায় ডা. আবদুল মোত্তালিব মালিককে পূর্ব পাকিস্তানে প্রেসিডেন্টের মূল ব্যক্তি এবং রিলিফ ও পুনর্বাসনে তাঁর বিশেষ সহকারী হিসেবে নিয়োগ দেন। তাঁর সদর দপ্তর ঢাকায় থাকবে।

পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো ইসলামাবাদে দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানে এবং বহিরাক্রমণের আশঙ্কা মোকাবিলায় নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের সুস্পষ্ট রায় মোতাবেক জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য আবার দৃঢ় দাবি জানান। ভুট্টো বলেন, নির্বাচনের পর ইতিমধ্যে বহু সময় নষ্ট হওয়ায় জনগণের মধ্যে উৎকণ্ঠা বেড়ে চলেছে।

তেহেরিকে ইশতিকলাল পার্টির প্রধান এয়ার মার্শাল (অব.) আসগর খান কোয়েটায় সংবাদ সম্মেলনে বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে যা ঘটেছে, তাতে সামগ্রিকভাবে শুধু দেশেরই ক্ষতি হয়নি, কাশ্মীর সমস্যারও ক্ষতি সাধিত হয়েছে।

পূর্ব পাকিস্তানে সফররত কানাডার সংসদীয় প্রতিনিধিদল যশোরের ঝিকরগাছা ও খুলনা পরিদর্শন করেন। সেখানে ১৭ জন অমুসলিমসহ ৫৬ জন ফিরে আসা শরণার্থী উপস্থিত ছিল।

বিজ্ঞাপন

সামরিক অভিযান

নরসিংদীর বেলাবতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের ভয়াবহ যুদ্ধ হয়। পাকিস্তানি সেনাদের বেলাব আক্রমণ প্রতিহত করার লক্ষ্যে সুবেদার বাশারের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা বেলাবর নিকটবর্তী এলাকা টোকের কাছে অ্যামবুশ করেন। পাকিস্তানি সেনারা স্থানীয় সহযোগীদের মাধ্যমে এ খবর পেয়ে লঞ্চের বদলে নৌকাযোগে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান অতিক্রম করে। পরে একটি খালি লঞ্চ ওখানে এলে মুক্তিযোদ্ধারা সেদিকে গুলিবর্ষণ শুরু করেন। ইতিমধ্যে পাকিস্তানি সেনারা পেছন দিক থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের ঘিরে ফেলে। দুই পক্ষের প্রবল যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা সুবেদার আবুল বাশার, সিপাহি আবদুল বারী, সিপাহি নূরুল ওহাব, সিপাহি সোহরাব হোসেন, সিপাহি মমতাজ উদ্দীন, সিপাহি আবদুল হক ও সিপাহি আবদুস সালাম শহীদ হন। বাকি মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটে নিরাপদ স্থানে চলে যান।

কুড়িগ্রামে একদল গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বড়খাতা অবস্থানে আক্রমণ চালিয়ে তাদের বেশ ক্ষতিসাধন করেন। যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা মুহাম্মদ আলী শহীদ হন।

ভারতে বাংলাদেশের পক্ষে

ভারতের শাসক দল নব কংগ্রেসের পশ্চিমবঙ্গে রাজ্য কমিটির সভায় বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে অবিলম্বে শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দিয়ে তাঁর নেতৃত্বে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ গঠনের দাবি জানানো হয়।

সারা ভারত বন্দর ও ডক ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি এস আর কুলকারনি মুম্বাইয়ে এক বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সোভিয়েত ইউিনয়ন, জার্মানি, জাপানসহ ১৩টি দেশের পরিবহনকর্মী সংস্থার কাছে অনুরোধ জানান, তাদের কর্মীরা যেন পাকিস্তানগামী সামরিক সম্ভারপূর্ণ বিমান বা জাহাজের কাজে হাত না লাগান। আবেদনে তিনি আরও বলেন, প্রতিটি দেশের প্রগতিশীল ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের প্রধান কর্তব্য ওই সব দেশের সরকারের ওপর পাকিস্তানের শাসকদের অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহে বিরত থাকতে নৈতিক চাপ সৃষ্টি করা।

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর দুই ও সাত; ইত্তেফাক, ১৫ ও ১৬ জুলাই ১৯৭১; আনন্দবাজার পত্রিকা, ভারত, ১৫ ও ১৬ জুলাই ১৯৭১

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান