default-image

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বন্দী হওয়ার পর ৫ মে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তান জানায় যে তিনি জীবিত ও সুস্থ আছেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. আকবর খান করাচিতে সাংবাদিকদের এ কথা জানান। তিনি বলেন, পাকিস্তানের আইন অনুসারে বঙ্গবন্ধুর বিচার হবে। সাংবাদিকেরা বঙ্গবন্ধুকে দেখতে চাইলেও সে অনুরোধ রাখা হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের চারজন সিনেটরের কাছে পররাষ্ট্র দপ্তরের সচিব ডেভিড অ্যাবশায়ারের লেখা একটি চিঠি এদিন ওয়াশিংটনে প্রকাশ করা হয়। ওই সিনেটরেরা পাকিস্তানকে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও রাজনৈতিক সাহায্য সম্পর্কে পররাষ্ট্র দপ্তরে চিঠি লিখেছিলেন। অ্যাবশায়ার সিনেটরদের জানান, চীনা আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের যেসব বিমান ও ট্যাংক পাকিস্তানকে দেওয়া
হয়েছিল, পাকিস্তান সরকার সেসব অস্ত্র পূর্ব পাকিস্তানে (বাংলাদেশ) ব্যবহার করছে। পূর্ব পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের এম ২৪ ট্যাংক ও এফ ৮৬ বিমান ব্যবহার করা হয়েছে। এসব অস্ত্র ব্যবহারের কারণে যুক্তরাষ্ট্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

বিজ্ঞাপন

ভারতে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত চেস্টার বোলসের সাক্ষাৎকার এদিন নিউইয়র্ক টাইমস-এ প্রকাশিত হয়। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, কার বিরুদ্ধে কী কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ব্যবহার করা হবে, তা না জেনে কাউকে মারণাস্ত্র দেওয়া নির্বুদ্ধিতা। অবিলম্বে দুটি ব্যবস্থা নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দরকার হয়ে পড়েছে: ১. মার্কিন সামরিক সরঞ্জামের অপব্যবহারের জন্য পাকিস্তান সরকারকে কড়া প্রতিবাদ জানানো এবং অবিলম্বে তাদের সাহায্য বন্ধ করে দেওয়া। ২. এশিয়ায় শান্তি ক্ষুণ্ন করায় নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক ডেকে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া। পূর্ব পাকিস্তানের একটি সশস্ত্র সংখ্যালঘু গোষ্ঠী বিশাল সংখ্যাগুরুকে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করায় যে অভ্যন্তরীণ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে, তা মীমাংসার জন্য জাতিসংঘের বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

জাতিসংঘের উদ্বাস্তুসংক্রান্ত হাইকমিশনার প্রিন্স সদরুদ্দিন আগা খান জেনেভায় এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ভারতের রাজ্যগুলোতে অসংখ্য উদ্বাস্তু মানবেতর জীবন যাপন করছে। তাঁদের সংস্থা শরণার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়েছে। তবে তারা স্থায়ী উদ্বাস্তুতে পরিণত হোক, সেটা কারও প্রত্যাশা নয়। পূর্ব পাকিস্তানে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা দরকার, যাতে আর কোনো শরণার্থী ভারতে না আসে এবং দেশত্যাগীরা স্বদেশে ফিরে যেতে পারে।

ভারতের ভেতরে

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সরকার ও বিরোধী দলের নেতারা বাংলাদেশে গণহত্যার প্রতিবাদে এবং বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানিয়ে এদিন এক বৈঠকে ৭ মে বিধানসভায় একটি সর্বসম্মত প্রস্তাব তোলার সিদ্ধান্ত নেন। বিধানসভার অধিবেশন শেষে মুখ্যমন্ত্রীর কক্ষে নেতাদের বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায়, উপমুখ্যমন্ত্রী বিজয় সিংহ নাহার, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. জয়নাল আবেদিন, বিরোধী দলের নেতা জ্যোতি বসু, সিপিএম নেতা হরেকৃষ্ণ কোঙার, সিপিআই নেতা বিশ্বনাথ মুখার্জি, সংযুক্ত বামফ্রন্টের আহ্বায়ক সুশীল কুমার প্রমুখ প্রস্তাবটি তৈরি করেন।

বাংলাদেশ সমন্বয় কমিটির ডাকে এই দিনকে কলকাতায় ‘বাংলাদেশ স্বীকৃতি দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। এ উপলক্ষে শহীদ মিনার ময়দানে সমাবেশের আয়োজন করা হয়। প্রখ্যাত রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী সুচিত্রা মিত্র ‘আমার সোনার বাংলা’ গান গেয়ে সভার সূচনা করেন। সভায় এক প্রস্তাবে বলা হয়, বাংলাদেশকে অবিলম্বে স্বীকৃতি ও সাহায্য দেওয়া ভারতের অপরিহার্য কর্তব্য। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ভারতের জাতীয় জীবনে অগ্নিপরীক্ষার মতো। এই অপূর্ব সুযোগ ব্যর্থ হলে ভারতের জাতীয় জীবন ধিক্কৃত হবে। প্রস্তাবটি পাঠ করেন সমর গুহ। সভাপতিত্ব করেন ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার। তিনি সভা চলাকালে অসুস্থ হয়ে পড়লে সভা পরিচালনা করেন শংকর প্রসাদ মিত্র। প্রস্তাবের সমর্থনে বক্তব্য দেন পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল সেন, পান্নালাল দাশগুপ্ত, মৈত্রেয়ী দেবী প্রমুখ।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশে গণহত্যা

পাকিস্তান সেনাবাহিনী পিরোজপুর দখলে নেওয়ার পর মহকুমা প্রশাসক আবদুর রাজ্জাক, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট মিজানুর রহমান এবং মহকুমা পুলিশ কর্মকর্তা ফয়জুর রহমান আহমেদকে এদিন গ্রেপ্তার করে। তাঁরা আর ফিরে আসেননি। শহীদ ফয়জুর রহমান আহমেদ কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের বাবা।

পাকিস্তানি সেনারা এদিন নাটোর চিনিকলেও গণহত্যা চালায়। গোপালপুর গণহত্যা নামে এই ঘটনাটি পরিচিত। সেনাবাহিনীর দল গোপালপুরে এসে চিনিকলের প্রায় ৫০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে আটক করে। সেনারা প্রথমে চিনিকলের প্রধান কর্মকর্তা আনোয়ারুল আজিমকে হত্যা করে। এরপর কর্মচারীদের চিনিকলের ভেতরে একটি পুকুরের সামনে সারি বেঁধে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে। চারজন বাদে সবাই মারা যান।

পাকিস্তানি সেনারা সিলেটের নানিয়াতেও এদিন ২৬ জন নিরীহ মানুষকে নির্যাতনের পর হত্যা করে।

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর তিন; দৈনিক পাকিস্তান, ৬ মে ১৯৭১; আনন্দবাজার পত্রিকা, কলকাতা, ভারত, ৬ মে ১৯৭১

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান