default-image

ভারতের ত্রিপুরা সীমান্তবর্তী ফেনীর বিলোনিয়া অঞ্চলের পরশুরামের বিরাট এলাকা ১০ নভেম্বর মুক্ত হয়। মুক্তিবাহিনীর ২ নম্বর সেক্টরের বিলোনিয়ায় যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধারা গোটা এলাকাটি মুক্ত করতে নভেম্বরের শুরু থেকে আক্রমণ বাড়িয়ে দেন। ৭ নভেম্বর রাতে পাকিস্তানি সেনারাও তীব্র পাল্টা আক্রমণ করে।

মুক্তিযোদ্ধারা ভারতীয় গোলন্দাজ বাহিনীর সহায়তায় তাদের জবাব দিতে থাকেন। ৮ থেকে ১০ নভেম্বর দুই পক্ষে কয়েকবার মুখোমুখি যুদ্ধ হয়।

পাকিস্তানিরা অপ্রতিরোধ্য আক্রমণের মুখে চারটি জেট দিয়ে গোলাবর্ষণ করে। মুক্তিযোদ্ধারা অবশেষে পাকিস্তানিদের দক্ষিণে ফুলগাজীর দিকে হটিয়ে দেন।

বিজ্ঞাপন

মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় এ সময় এগিয়ে আসে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ২৩ মাউন্টেন ডিভিশনের তৃতীয় ডোগরা রেজিমেন্ট।

তারা ইতিমধ্যে বিপর্যস্ত পাকিস্তানি বাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। মুক্তিযোদ্ধারা দুই ঘণ্টার মধ্যে পরশুরামের বিরাট এলাকা দখল করে নেন।
দুই কর্মকর্তাসহ ৭২ জন পাকিস্তানি সেনা আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। এটি ছিল মুক্তিবাহিনীর কাছে এককভাবে পাকিস্তানি সেনাদের আত্মসমর্পণের সবচেয়ে বড় ঘটনা।

এ যুদ্ধে হতাহত হয় ১৫০ জনের মতো পাকিস্তানি। মুক্তিবাহিনীরও যথেষ্ট ক্ষয়ক্ষতি হয়।
যুক্তরাজ্যের দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ-এর সংবাদদাতা এ দিন ঢাকা থেকে পাঠানো খবরে জানান, মুক্তিবাহিনী গত দুই সপ্তাহে বাংলাদেশের সাতটি এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।

ঢাকার কাছের মধুপুর জঙ্গল এবং দক্ষিণে সুন্দরবন এলাকা তাদের দখলে রয়েছে।
২ নম্বর সেক্টরের ঢাকা অঞ্চলের বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল গ্রিন রোডে রেডিও পাকিস্তানের উপপ্রধান প্রকৌশলীর অফিসে অভিযান চালায়।

তাদের গুলিতে রেডিও পাকিস্তানের খুলনা কেন্দ্রের আঞ্চলিক প্রকৌশলী বজলে হালিম নিহত এবং দুজন আঞ্চলিক প্রকৌশলী আহত হয়।
ঢাকা অঞ্চলের গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের আরও দুটি দলের একটি হলিক্রস কলেজের ভেতরে এবং আরেকটি আজিমপুর গার্লস স্কুলের ভেতরে বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়।
নারায়ণগঞ্জ অঞ্চলের গেরিলা মুক্তিযোদ্ধারা পাট করপোরেশনের পাটগুদামে আগুন ধরিয়ে দেন।

৮ নম্বর সেক্টরের একদল মুক্তিযোদ্ধা যশোরের চৌগাছার হাজীপুরে রেঞ্জারস ও রাজাকার সমন্বয়ে গড়া পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থানে হামলা করেন। পাল্টাপাল্টি যুদ্ধে কয়েকজন রেঞ্জারস ও রাজাকার হতাহত হয়।

মুক্তিযোদ্ধাদের একজন শহীদ ও একজন আহত হন।কলকাতার একটি কূটনৈতিক মিশনের একজন কনসাল জেনারেল এ দিন সাংবাদিকদের বলেন, সূর্যাস্তের পর ঢাকা এখন মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।

ওই কনসাল জেনারেল কিছুদিন আগে ব্যাংকক হয়ে ঢাকা গিয়ে তিন দিন অবস্থানের পর কলম্বো হয়ে ৯ নভেম্বর কলকাতা ফিরেছেন।

তিনি বলেন, ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ যাওয়ার পথে কোনো বাড়িতে তিনি মানুষ দেখতে পাননি। সেখানে একটি হোটেলে বিদেশি সাংবাদিকেরা তাঁকে বলেন, সামরিক বাহিনীর মনোবল সম্পূর্ণ ভেঙে গেছে।

বিজ্ঞাপন

ইন্দিরা-উইলি ব্রান্ট সাক্ষাৎ

বাংলাদেশের পক্ষে জনমত সংগ্রহের লক্ষ্যে বিদেশ সফররত ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এ দিন তিন দিনের সফরে পশ্চিম জার্মানিতে পৌঁছেই দেশটির চ্যান্সেলর উইলি ব্রান্টের সঙ্গে আলোচনায় বসেন।

তাঁরা একমত হন যে পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে এই সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান দরকার।
ইন্দিরা গান্ধী উইলি ব্রান্টকে বলেন, ভারতের নিরাপত্তায় শঙ্কা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ সমস্যার দ্রুত রাজনৈতিক সমাধান প্রয়োজন। উইলি ব্রান্ট ভারতের প্রতি তাঁর দেশের সহানুভূতির আশ্বাস দেন।
জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি সমর সেন বলেন, জাতিসংঘ শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে আলোচনা করে বাংলাদেশ সংকটের রাজনৈতিক সমাধান বের করতে পারলে ভারত স্বাগত জানাবে।
যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র এ দিন রাতে পাকিস্তানে ব্রিটিশ অস্ত্র রপ্তানির কথা অস্বীকার করেন।

যুক্তরাজ্যের কিছু পত্রিকায় খবর বেরোয়, গত কয়েক মাসে দেশটি থেকে বিমান, ট্যাংক ও কামান ইত্যাদি পাকিস্তানে গেছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, খবরটি ভিত্তিহীন।

সোভিয়েত ইউনিয়নে নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত ড. কে এস শেলভেঙ্কর ১০ নভেম্বর দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী মার্শাল আন্দ্রে গ্রেচকোর সঙ্গে আলোচনা করেন।

আলোচনার বিষয়বস্তু প্রকাশ করা না হলেও ওয়াকিবহাল মহল জানায়, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ঘিরে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে উদ্ভূত যুদ্ধের হুমকি নিয়েই তাঁরা আলোচনা করেছেন।

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভারতকে আশ্বাস দিয়েছে, সে সংকটে তাদের কাছ থেকে সব ধরনের সাহায্য ভারত পাবে।
সিঙ্গাপুরের পাকিস্তান হাইকমিশনের বাঙালি কর্মী আলী আহমদ ৯ নভেম্বর পাকিস্তানের পক্ষ ত্যাগ করে চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাইকে একটি খোলা চিঠি দিয়েছেন।

চিঠিতে তিনি চৌ এন লাইকে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে সমর্থন না করতে অনুরোধ জানান। তিনি আরও বলেন, পূর্ববঙ্গবাসী এ ব্যাপারে চীন ও অন্য সমাজতন্ত্রী দেশের সমর্থন কামনা করে।

ভুট্টোর মন্তব্য

পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো লাহোরে জনসভায় বলেন, পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ বাধলে তা শুধু এই দুই দেশের সীমান্তে সীমাবদ্ধ থাকবে না। চীনের চেয়ারম্যান মাও সে–তুংয়ের সঙ্গে দেখা করলে তিনি এবং চৌ এন লাই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, পাকিস্তানকে তাঁরা পুরো সহযোগিতা করবেন।
সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর আট; ইত্তেফাক, ঢাকা, ১১ নভেম্বর ১৯৭১; আনন্দবাজার পত্রিকা, কলকাতা, ভারত, ১১ ও ১২ নভেম্বর ১৯৭১; দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ, লন্ডন, ১১ নভেম্বর ১৯৭১
গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান

বিজ্ঞাপন