default-image

ভারত-পূর্ব পাকিস্তান সীমান্তবর্তী অঞ্চলে পাকিস্তানি সেনা জমায়েত এবং উপর্যুপরি হামলায় পাকিস্তানকে হুঁশিয়ারি জানিয়ে দিল্লির পাকিস্তান হাইকমিশনের কাছে ১৫ এপ্রিল ভারত কড়া প্রতিবাদ জানায়। বহির্বিষয়ক মন্ত্রক থেকে পাঠানো এই প্রতিবাদে বলা হয়, ত্রিপুরা সীমান্তের কাছে সেনা সমাবেশ ঘটিয়ে পাকিস্তান বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। এ ধরনের আক্রমণাত্মক কাজকর্ম বন্ধ করার জন্য অবিলম্বে পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনীকে যথোপযুক্ত নির্দেশ দেওয়ার জন্য ভারত আহ্বান জানায়।

কলকাতার ‘আনন্দবাজার’ পত্রিকার বিশেষ সংবাদদাতা দিল্লি থেকে পাঠানো এক রিপোর্টে জানান, ভারত সরকারের কাছে ‘পূর্ব পাকিস্তান’ শব্দের স্থান করে নিয়েছে ‘পূর্ববঙ্গ’। ভারতের বহির্বিষয়ক মন্ত্রক এই প্রথম পাকিস্তান হাইকমিশনকে দেওয়া তাদের সরকারি নোটের সর্বত্র ‘পূর্ববঙ্গ’ কথাটি ব্যবহার করল। ভারতীয় এলাকায় পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর গুলিবর্ষণের প্রতিবাদে নোটটি দেওয়া হয়।

সংবাদ সংস্থা এএফপি এক খবরে বলে, ঢাকা এখন মৃত্যুপুরী। সেনারা ঘরে ঘরে তল্লাশি চালাচ্ছে। তরুণদের নিয়ে যাচ্ছে আটক করে। রাস্তায় মানুষ বিরল। অনেকেই শহর ছেড়ে গেছেন। যারা ঢাকা থেকে পালাতে চাইছে তাদের বাধা দেওয়া হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

দুই সপ্তাহ ধরে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রচণ্ড সামরিক হামলার মুখে মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটেন। পশ্চিমা জেলাগুলোর প্রধান শহর-বন্দর পাকিস্তানি বাহিনী আজ দখলে নেয়। বহু বাঙালি সেনা ও কর্মকর্তা নিজেদের গুছিয়ে তোলার জন্য ভারতের সীমান্ত শহরগুলোতে আবার জমায়েত হয়েছেন।

‘নিউইয়র্ক টাইমস’-এ ১৫ এপ্রিল প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ছত্রভঙ্গ হয়ে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধারা আবার সংগঠিত হতে চেষ্টা করছেন।

আন্তর্জাতিক মহলে

নিউজিল্যান্ডের ভারপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী জ্যাক মার্শাল এক বার্তায় এই আশা প্রকাশ করেন, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান অবিলম্বে পূর্ব পাকিস্তানের বর্তমান গৃহযুদ্ধের অবসানের ব্যবস্থা করবেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটর ওয়াল্টার মন্ডেল ও সিনেটর কেস যৌথভাবে পাকিস্তানে সাহায্য বন্ধের জন্য ২১ নম্বর প্রস্তাব পেশ করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র অস্ত্র সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, গত অক্টোবরের ব্যতিক্রম ছাড়া পাকিস্তানে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে।

অবরুদ্ধ বাংলাদেশের চালচিত্র

পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক কর্তৃপক্ষ এই দিন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কর ও খাজনা পরিশোধ করতে সবাইকে নির্দেশ দেয়।

চাকমা রাজা এবং ১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত জাতীয় পরিষদ সদস্য (স্বতন্ত্র) ত্রিদিব রায়ের আহ্বানে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি দল রাঙামাটি শহরে প্রবেশ করে।

পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র পরিষদ তাদের ছাত্র-কর্মীদের সেনাবাহিনীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের খতমের নির্দেশ দেন।

মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা

পাকিস্তান সেনাবাহিনী হেলিকপ্টার গানশিপ, নেভাল গানবোট ও এফ-৮৬ বিমান দিয়ে ১৪ এপ্রিল থেকে চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ও ইপিআর সেনা সমন্বয়ে গড়া মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন প্রতিরক্ষা অবস্থানের ওপর আক্রমণ শুরু করে। পাকিস্তানি সেনারা এর আগে মুক্তিযোদ্ধাদের হাত থেকে গঙ্গাসাগর কেড়ে নিয়েছিল। এই দিন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কাছ থেকে তাঁরা এলাকাটি পুনরুদ্ধার করেন।

আরেক দল মুক্তিযোদ্ধার প্রতিরক্ষা অবস্থান ছিল ভৈরব রেলসেতুর কাছে মেথিকান্দায়। পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাদের অবস্থানে বিমান ও কামান দিয়ে হামলা চালায়। দুই পক্ষে দিনব্যাপী প্রচণ্ড সংঘর্ষের পরে ১৫ এপ্রিল ভৈরবের পতন হয়। পাকিস্তানি বাহিনী ভৈরবে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায় এবং লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগ করে।

বিজ্ঞাপন

বৃহত্তর রংপুরে মুক্তিবাহিনীর চারটি দলের প্রথমটি কাকিনায়, দ্বিতীয় দল পাটেশ্বরী ঘাটে, তৃতীয় দল পাটের ঘাটের কাছে রৌমারী সড়কে এবং চতুর্থ দল ফুলবাড়ি থানায় প্রতিরক্ষা নেয়।

এই দিন বিকেলে পাকিস্তানি সেনারা ট্রাক ও জিপে করে গুলি করতে করতে ঝিনাইদহ শহরে প্রবেশ করে। আতঙ্কিত শহরবাসী আগেই শহর ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গিয়েছিল।

চট্টগ্রামের রাজাঘাট এলাকাও এই দিন পাকিস্তানি বাহিনীর দখলে চলে যায়।
দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের লেফটেন্যান্ট এজাজের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা সীতাকুণ্ড এলাকায় নাজিরহাট থেকে কয়েক মাইল দূরে উদালিয়া চা-বাগানে ঘাঁটি স্থাপন করেছিলেন। মিরসরাই যুদ্ধ শেষে পাকিস্তানি সেনারা চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে উদালিয়া চা-বাগানের কাছে আসে। দুই পক্ষে প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হয়। পাকিস্তানি সেনাদের প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে মুক্তিসেনারা উদালিয়া চা-বাগানের ঘাঁটি ছেড়ে অন্যত্র চলে যান।

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: দলিলপত্র, ত্রয়োদশ খণ্ড; বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টর ভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর এক, দুই, সাত ও আট; দৈনিক পাকিস্তান, ১৬ এপ্রিল ১৯৭১; আনন্দবাজার পত্রিকা, ১৬ এপ্রিল, ১৯৭১
গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান