default-image

পাকিস্তানের ঘরোয়া ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না করতে ভারতের প্রতি আহ্বান জানাল চীন। চীনের প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই ১১ এপ্রিল পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে পাঠানো এক চিঠিতে বলেন, চীন সরকার মনে করে পাকিস্তানে যা ঘটছে, সেটি তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। পাকিস্তানকে তিনি আশ্বাস দেন, ভারত আক্রমণ করলে পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রামে দৃঢ় সমর্থন দেবে চীন।

বাংলাদেশের সংগ্রামে ভারতের ভূমিকা নিয়ে এই দিনে চীনের পিপলস ডেইলিতে নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। ‘ভারতীয় সম্প্রসারণবাদীরা কী করতে চাইছে’ শিরোনামের নিবন্ধে বলা হয়, পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের নেওয়া পদক্ষেপ নিয়ে হস্তক্ষেপের অধিকার কোনো দেশের নেই। তা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, সংসদ সদস্য থেকে শুরু করে ভারতের কোনো কোনো রাজ্যের মন্ত্রীরা শোরগোল শুরু করেছেন। ভারত সরকার জাতিসংঘে দুই পরাশক্তি সঙ্গে নিয়ে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের ষড়যন্ত্র আঁটছে।

ওই নিবন্ধে আরও বলা হয়, সোভিয়েত সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকের সুপ্রিম সোভিয়েতের প্রেসিডিয়াম সভাপতি নিকোলাই পদগর্নি ইয়াহিয়া খানকে পাঠানো বার্তায় ভারতীয় প্রতিক্রিয়াশীলদের হুমকির প্রসঙ্গ উল্লেখই করেননি, অথচ উল্টো অশিষ্টের মতো পাকিস্তান সরকারের সমালোচনা করেছেন। নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়, প্রতিটি জাতিরই পারস্পরিক সম্মানের পাঁচটি নীতি মেনে চলা উচিত। নীতিগুলো হচ্ছে সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ডের অখণ্ডতা, অনাক্রমণ, পারস্পরিক অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, সমতা এবং পারস্পরিক কল্যাণ ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের পক্ষে কলকাতায় জনসমর্থন, নিয়াজির দায়িত্ব গ্রহণ

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে আগের রাতে দেওয়া বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বেতার ভাষণ ১১ এপ্রিল আবার প্রচারিত হয়। আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্র থেকেও তা প্রচার করা হয়।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে বাংলাদেশ মুক্তিসংগ্রাম সহায়ক সমিতি বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের সমর্থনে জনসভা করে। সেখানে অবিলম্বে বাংলাদেশ সরকারকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দিতে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখোপাধ্যায় প্রস্তাব উত্থাপন করেন। বিহারের মুখ্যমন্ত্রী কর্পুরী ঠাকুর তা সমর্থন করেন।

এদিন দিল্লিতে সরকারিভাবে জানানো হয়, পাকিস্তানের সাবমেরিনে কর্মরত আটজন বাঙালি নাবিক ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। ফান্সের একটি বন্দরে থাকা পাকিস্তানের সাবমেরিন থেকে পালিয়ে তাঁরা ভারতে আসেন।

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ অর্গানাইজেশন ১১ এপ্রিল ‘পাকিস্তান সংকট-ঘটনা ও পরিণতি’ শিরোনামে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে।

ঢাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশ) সামরিক কমান্ডের অধিনায়ক হিসেবে এদিন লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেন। তিনি টিক্কা খানের স্থলাভিষিক্ত হন। ৩ এপ্রিল তাঁর নিয়োগ হওয়ার পর ৪ এপ্রিল তিনি ঢাকায় এসেছিলেন।

এদিন ঢাকায় সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের ভিত্তিহীন প্রচারণা অব্যাহত রাখার জন্যই নয়াদিল্লির বেতার পূর্ব পাকিস্তানে নির্যাতনের কাল্পনিক কাহিনি প্রচার করে যাচ্ছে।

মুক্তিযোদ্ধাদের লড়াই

ঝিকরগাছার কোটচাঁদপুরে পাকিস্তানি বাহিনী আসার খবর পেয়ে মুক্তিবাহিনীর একটি দল রাস্তায় অ্যামবুশ পাতে। শেষ বিকেলে ১০টি গাড়ির বহর আয়ত্তে এলে মুক্তিবাহিনী আক্রমণ চালায়। পাকিস্তানিদের সামনের তিনটি গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পাশের খালে পড়ে যায়। কালা মিয়া নামের এক মুক্তিযোদ্ধা কাছে গিয়ে গ্রেনেড ছুড়লে চারটি গাড়িতে আগুন ধরে যায়। পাকিস্তানিদের পাল্টা আক্রমণে তিনি শহীদ হন।

পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এদিন চট্টগ্রামের কালুরঘাটে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের ওপর আর্টিলারি, মর্টার, গানবোটসহ অন্য আরও আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের সাহায্যে আক্রমণ করে। এ সময় দুই পক্ষে তুমুল সংঘর্ষ হয়। এ সংঘর্ষে আটজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ ও অনেকে আহত হন। বেশ কিছু পাকিস্তানি সেনাও নিহত হয়। মুক্তিবাহিনীর লেফটেন্যান্ট শমসের মবিন চৌধুরী (বীর বিক্রম। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রদূত ও পররাষ্ট্রসচিব) গুরুতর আহত অবস্থায় পাকিস্তানিদের হাতে বন্দী হন।

দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি দলের সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের যুদ্ধ হয়। ভারী অস্ত্রসজ্জিত পাকিস্তানি বাহিনীর তুমুল আক্রমণের মুখে মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটে চরখাইয়ে চলে যান। মুক্তিবাহিনী সেখানে নতুন প্রতিরক্ষাব্যূহ গড়ে তোলে। পাকিস্তানি বাহিনী যাতে চরখাই আক্রমণ করতে না পারে, সে জন্য মুক্তিবাহিনীর একটি কোম্পানি ফুলবাড়ীর চরখাই রোডে, একটি কোম্পানি ঘোড়াঘাট-চরখাই রোডে অবস্থান নেয়। একটি কোম্পানি ডেপথ কোম্পানি হিসেবে রাখা হয়।

পাকিস্তান সেনাবাহিনী এই দিন গোপালগঞ্জ দখল করে স্থানীয় কিছু লোকের সহায়তায় মানিকহারে মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি আক্রমণ করে। স্বল্প প্রশিক্ষিত মুক্তিযোদ্ধারা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। পাকিস্তানি সেনারা মানিকহার গ্রামটি জ্বালিয়ে দেয়।

পাকিস্তান সেনাবাহিনী সকালে পাবনা জেলার ঈশ্বরদী দখল করে। তারা প্রবেশের পর অবাঙালিরা নূর মহলা ও ফতে-মোহাম্মদপুর এলাকায় হত্যাকাণ্ড ও লুটতরাজে অংশ নেয়। তাদের হাতে ৩২ জন বাঙালি প্রাণ হারান।

যশোর-বেনাপোল সড়কে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের মুখোমুখি সংঘর্ষে দুই পক্ষে বেশ কয়েকজন হতাহত হয়।

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: দলিলপত্র, ত্রয়োদশ খণ্ড; বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর এক, সাত ও আট; রক্তে ভেজা একাত্তর, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম, (সাহিত্য প্রকাশ); দ্য বিট্রেয়াল অব ইস্ট পাকিস্তান, লে. জেনারেল এ এ কে নিয়াজি, (অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, পাকিস্তান); আনন্দবাজার পত্রিকা, ভারত, ১২ এপ্রিল ১৯৭১; দৈনিক পাকিস্তান, ১২ এপ্রিল ১৯৭১

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান

বিজ্ঞাপন