default-image

পাকিস্তানের অব্যাহত মিথ্যা প্রচারের প্রতিবাদে ১৮ মে বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়। সরকারের তথ্য বিভাগ বিবৃতিতে বলেছে, বাংলাদেশে চলমান ব্যাপক জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতা দমন করার জন্য সেনাবাহিনী নিয়োগ করতে হয়েছে বলে পাকিস্তান অপপ্রচার চালাচ্ছে। সে অপপ্রচারের ভিত্তিতে বিদেশের কিছু সংবাদপত্রে খবর প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার এই অপপ্রচারের প্রতিবাদ জানায়।

বাংলাদেশ সরকারের তথ্য বিভাগ ১৮ মে বিবৃতিতে উল্লেখ করেছে, ২৬ মার্চ থেকে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের অপপ্রচার বিশ্ববাসী বিশ্বাস করেনি। পাকিস্তানের সামরিক কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তার মর্যাদা পুনরুদ্ধারের চেষ্টায় অসত্য ভাষণের আশ্রয় নিয়েছে, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে বিকৃতভাবে প্রচার করার চেষ্টা করেছে। পাকিস্তান কর্তৃপক্ষের নৃশংস আচরণে বাংলাদেশে অন্তত ১০ লাখ লোকের প্রাণহানি ঘটেছে এবং ৩০ লাখ লোক উদ্বাস্তু হয়েছেন।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, মুক্তিবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় বিদেশি সাংবাদিকেরা ঘুরে এসে এমন কোনো কথা বলেননি যে বাঙালিরা জাতিগত বা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধিয়েছিল। অথচ পাকিস্তান সেনাবাহিনী যেদিকেই গেছে সেদিকেই বাঙালিদের হত্যা, লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগের কাজে তারা অবাঙালিদের লেলিয়ে দিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আরেকটি প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ সরকার জানায়, পাকিস্তানের সামরিক চক্র তাদের গণহত্যার পাপ ঢাকার জন্য বিদেশে বলছে যে বাংলাদেশে অবাঙালি মুসলমানদের হত্যা করার কারণেই সামরিক বাহিনী হস্তক্ষেপ করেছে। এটা মিথ্যাচার। ২৬ মার্চ পর্যন্ত ঢাকায় যে ৪০ জন বিদেশি সাংবাদিক ছিলেন, তাঁরা এমন ঘটনা দেখেননি।

পাকিস্তান বৌদ্ধ পরিষদের সভাপতি জ্যোতিপাল মহাথেরোর নেতৃত্বে পাঁচজন বৌদ্ধ নেতা এক আবেদনে বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে নির্বিচার লাখ লাখ মানুষ মেরে ফেলা হচ্ছে। অধিকাংশ বৌদ্ধমঠ ধ্বংস এবং কুমিল্লায় ছয়জন বৌদ্ধধর্মাবলম্বীকে খুন করা হয়েছে। আবেদনে তাঁরা গণহত্যার বিরুদ্ধে সারা পৃথিবীর সহানুভূতি প্রার্থনা করেন।

ভারতে বাংলাদেশের পক্ষে

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেন, ভারতের ওপর কোনো পরিস্থিতি পাকিস্তান চাপিয়ে দিলে তাঁরা
তা মোকাবিলা করতে প্রস্তুত। ভারতে শরণার্থীর ক্রমবর্ধমান হার এ অঞ্চলের শান্তির পক্ষে হুমকি হয়ে উঠছে। এটি অব্যাহত থাকলে ভারত তার জাতীয় স্বার্থে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য হবে।

পূর্ববঙ্গে সবকিছু স্বাভাবিক বলে পাকিস্তানের দাবিকে চ্যালেঞ্জ করে ইন্দিরা গান্ধী বলেন, তা হয়ে থাকলে ভারত থেকে সব শরণার্থীকে পাকিস্তানের অবিলম্বে দেশে ফিরিয়ে নেওয়া উচিত।

পিটিআই এদিন এক খবরে জানায়, ভারত পশ্চিমা শক্তিগুলোকে এই বলে হুঁশিয়ার করে দিয়েছে, বাংলাদেশের পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে নির্দিষ্ট কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়, শিগগির তা ভাবতে হবে। দিনের পর দিন অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে। ভারতের সামাজিক পরিস্থিতির ওপরও এর গুরুত্ব রয়েছে। পাকিস্তান ভারতকে চরম বিপদের মুখে ফেলে দিয়েছে। কোনো দেশেরই এরূপ করার অধিকার নেই। পরিস্থিতি না বদলালে ভারতকে নির্দিষ্ট পথের কথা ভাবতে হবে।

ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মচারীদের পত্নী সমিতি দিল্লিতে বাংলাদেশ সহায়ক কমিটিকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকার একটি চেক প্রদান করে। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মুখ্য সচিব পি এন হাকসারের স্ত্রী উর্মিলা হাকসার চেকটি পদ্মজা নাইডুর হাতে দেন।

বিজ্ঞাপন

ইউরোপ ও আমেরিকায়

পাকিস্তান প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের ফ্রাঙ্ক চার্চ বলেন, নিরপেক্ষ থাকতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে পাকিস্তানে সামরিক ও অর্থনৈতিক সাহায্য বন্ধ করতে হবে। দেশটির সিনেটে দেওয়া বিবৃতিতে তিনি বলেন, নির্বাচনে জয়ী নেতাদের হত্যা এবং পূর্ব বাংলার জনসাধারণের ওপর অত্যাচার চালানোর ঘটনা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্বেগের বিষয় নয় বলে পাকিস্তান সামরিক সরকার যে যুক্তি দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের উচিত তা বাতিল করে দেওয়া।

জাতিসংঘে নিযুক্ত পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি আগা শাহী জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কমিটির বৈঠকে পূর্ব পাকিস্তান থেকে ৩০ লাখ শরণার্থীর যাওয়া এবং পূর্ব পাকিস্তানে খাদ্য সরবরাহ করছে না বলে ভারতের উত্থাপিত অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, তবু মানবিক কারণে পূর্ব পাকিস্তানকে সাহায্য দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু তার জন্য পাকিস্তান সরকারের অনুমতি নিতে হবে।

আগা শাহী এই দিন যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটের বৈদেশিক সম্পর্ক কমিটির চেয়ারম্যান জে উইলিয়াম ফুলব্রাইটকে এক চিঠি দেন। চিঠিতে তিনি বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে জনতা লুটতরাজ এবং নিরীহ নাগরিকদের হত্যা করতে থাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিরুপায় হয়ে বলপ্রয়োগে বাধ্য হয়।

সুইডেনের স্টকহোম থেকে প্রকাশিত দৈনিক ডিজেনস নাইটার ১৮ মে এক সম্পাদকীয় নিবন্ধে পাকিস্তানকে সব রকমের সাহায্য বন্ধ করে দেওয়ার আবেদন জানায়। ‘পাকিস্তান ও আমাদের সাহায্য’ শিরোনামের এই সম্পাদকীয়তে বলা হয়, হত্যাকাণ্ড শুরু হয়ে যাওয়ায় পাকিস্তানে আর আইনের শাসন নেই। ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা বাইরের সাহায্য নিয়ে হত্যা চালাচ্ছে এবং আর্তদের জন্য একান্ত প্রয়োজনীয় সাহায্য ঘৃণার সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করছে। সেই দেশকে সুইডেনের সাহায্যদান অব্যাহত রাখার অর্থ কী?

পাকিস্তান ও অবরুদ্ধ বাংলাদেশে

পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেন, পূর্ব পাকিস্তানের বর্তমান সংকট পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় সংকট। আমলাতন্ত্রে এর সমাধান নেই। ক্ষমতা হস্তান্তরে আরও বিলম্ব হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। এই দিন পাকিস্তান অবজারভার পত্রিকায় তাঁর এ মন্তব্য প্রকাশিত হয়। ক্ষমতা হস্তান্তর বলতে ভুট্টো শুধু পশ্চিম পাকিস্তানেই ক্ষমতা হস্তান্তর বুঝিয়েছেন।

পাকিস্তান সরকার এই দিন পূর্ব পাকিস্তানের চিফ সেক্রেটারি, পুলিশের আইজি, বিভাগীয় কমিশনার, বেশ কয়েকজন জেলা প্রশাসক ও এসপিসহ প্রাদেশিক সরকারের পদস্থ কিছু কর্মকর্তাকে পশ্চিম পাকিস্তানে বদলি করে। আর তাদের জায়গায় পশ্চিম পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেয়।

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর এক ও দুই; পূর্বদেশ, ১৯ মে ১৯৭১; আনন্দবাজার পত্রিকা, কলকাতা, ভারত, ১৯ ও ২০ মে ১৯৭১; যুগান্তর, ভারত, ১৯ মে ১৯৭১

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান

বিজ্ঞাপন