default-image

বাংলাদেশ সরকারকে সহায়তার জন্য মুজিবনগরে ৯ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগসহ পাঁচটি দলের আটজন সদস্য নিয়ে একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠিত হয়। নবগঠিত এই কমিটি মুক্তিসংগ্রামে বাংলাদেশ সরকারকে পরামর্শ দেবে।

বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীকে আহ্বায়ক করে ভাসানী ও ওয়ালিপন্থী দুই ন্যাপ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (মস্কোপন্থী), বাংলাদেশ জাতীয় কংগ্রেস ও আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি নিয়ে কমিটিটি গঠিত হয়। দুই দিন ধরে যৌথ বৈঠকের পর সর্বসম্মতভাবে এই কমিটি গঠিত হয়। বাংলাদেশে পাকিস্তানের শোষণের বিরুদ্ধে যাঁরাই লড়াই করছেন, তাঁদের সবার মধ্যে একাত্মতা গড়ে তোলা এই কমিটি গঠনের মূল উদ্দেশ্য।

বিজ্ঞাপন

আটজনের এই কমিটিতে ছিলেন ভাসানী ন্যাপের মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, কমিউনিস্ট পার্টির মণি সিংহ, বাংলাদেশ জাতীয় কংগ্রেসের মনোরঞ্জন ধর, ওয়ালি ন্যাপের অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদ এবং আওয়ামী লীগ থেকে আরও দুজন সদস্য। আগের দুই দিনের বৈঠকে বাংলাদেশ সরকারের অন্য মন্ত্রীরাও উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া ছিলেন রাজনৈতিক উপদেষ্টা আবদুস সামাদ আজাদ।

বৈঠকে বাংলাদেশ সরকারকে স্বাধীনতা আন্দোলনে পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে সাত দফার এক প্রস্তাবও নেওয়া হয়। প্রস্তাবে বলা হয়, পূর্ণ স্বাধীনতা ছাড়া রাজনৈতিক সমাধান অসম্ভব। যৌথ বৈঠকে গৃহীত সাত দফা প্রস্তাবে বলা হয়, বাংলাদেশের শান্তিপ্রিয় গণতান্ত্রিক জনসাধারণের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করার জন্য ভারত এবং পৃথিবীর অন্য দেশকে অবিলম্বে বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি দিতে হবে। অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে সক্রিয় সাহায্য করার জন্য কমিটির পক্ষ থেকে বিশ্ববাসীর কাছে আবেদন জানানো হয়। প্রস্তাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জবরদস্তিমূলক বিচার বন্ধ করার জন্য জাতিসংঘ এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর কাছে অনুরোধ জানানো হয়। পশ্চিম পাকিস্তানি জঙ্গিশাহি বাংলাদেশের জাতীয় নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে বেআইনিভাবে আটক রাখার বিরুদ্ধেও ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও শরণার্থীদের প্রতি ভারত সরকার এবং ভারতের অধিবাসীদের সহায়তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়।

পাকিস্তানকে সোভিয়েতের হুঁশিয়ারি

দিল্লিতে একটি কূটনৈতিক সূত্র মস্কো ও ইসলামাবাদ থেকে পাওয়া সংবাদের ভিত্তিতে সাংবাদিকদের জানায়, ভারতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার মতো অতি দুঃসাহসী পদক্ষেপ না নেওয়ার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন পাকিস্তানকে আবার হুঁশিয়ার করে দিয়েছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রসচিব ও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার ব্যক্তিগত দূত সুলতান মহম্মদ খান মস্কো সফরকালে তাঁকে এ কথা জানানো হয়।

সোভিয়েত পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রে গ্রোমিকো ও তাঁর সহকারী ফিরুবিনের সঙ্গে আলোচনার সময় সুলতান মহম্মদ খান পাকিস্তানের সংহতি ও অখণ্ডতার ব্যাপারে ভারতের যোগসাজশ ও ষড়যন্ত্র এবং পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক সমাধানের জন্য তথাকথিত ব্যবস্থা ইত্যাদি বোঝানোর চেষ্টা করেন। মস্কোর কূটনৈতিক মহল জানায়, পাকিস্তানের ব্যাখ্যা সোভিয়েত কর্তৃপক্ষের মনে কোনো দাগ কাটতে পারেনি।

অপারেশন ওমেগার প্রধান সংগঠক রজার মোদি কলকাতায় সাংবাদিকদের জানান, তাঁদের যে চারজন সদস্য বাংলাদেশে যাওয়ার পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে আটক হয়েছিলেন, তাঁরা যশোর জেলে বন্দী। তাঁরা অনির্দিষ্টকালের জন্য অনশন শুরু করেছেন বলে তিনি খবর পেয়েছেন। আটক ওই চারজন সদস্যকে দু-এক দিনের মধ্যে আদালতে হাজির করা হবে। কলকাতার যুক্তরাষ্ট্রের কনস্যুলেট তাদের ঢাকা অফিসের মাধ্যমে জেনেছে, তাঁরা আইনি সাহায্য নিতে অস্বীকার করেছেন।

বিজ্ঞাপন

ভারতীয় জনসংঘের সভাপতি অটল বিহারি বাজপেয়ি দিল্লিতে সাংবাদিকদের বলেন, তাঁরা চান স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা। যতক্ষণ না তা হচ্ছে, ততক্ষণ শরণার্থীদের স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের কথা বলা নিতান্তই অর্থহীন। ভারত যদি মুক্তিবাহিনীকে সাহায্য করে, তবেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভ সহজতর হবে। এ সাহায্য করার জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন বাংলাদেশকে ভারতের স্বীকৃতি।

সুইডেন সফররত যুক্তরাজ্য ও বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের দূত বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী এ দিন বিকেলে রাজধানী স্টকহোমে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেন।

বিশ্ব শান্তি পরিষদ জাতিসংঘ মহাসচিব উ থান্টকে দেওয়া এক স্মারকলিপিতে অভিমত প্রকাশ করে, শুধু বাংলাদেশের মানুষের প্রকৃত প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেই বাংলাদেশের সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান খুঁজে পাওয়া যাবে। নিজেদের ভবিষ্যৎ স্থির করার অধিকার বাংলাদেশের মানুষের রয়েছে।

বিশ্ব শান্তি পরিষদের মহাসচিব রমেশ চন্দ্র নিউইয়র্কে জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁর হাতে এই স্মারকলিপি দেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন গিনির পররাষ্ট্রমন্ত্রী, ইরাকের একজন প্রতিমন্ত্রী, ফ্রান্সের একজন সিনেটর ও হাঙ্গেরির একজন আর্চবিশপ।

গেরিলা অভিযান

২ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা এ দিন মন্দভাগে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে যুদ্ধ করেন। পাকিস্তানিরা মন্দভাগে মুক্তিবাহিনীর অবস্থানে আক্রমণ চালালে মুক্তিযোদ্ধারা সে আক্রমণ প্রতিহত করেন। পাকিস্তানি সেনারা পরে মুক্তিবাহিনীর মইনপুর অবস্থানে আক্রমণ চালায়। প্রায় দুই ঘণ্টার যুদ্ধে কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা হতাহত হয়। মুক্তিবাহিনীর নয়জন মুক্তিযোদ্ধা আহত হন।

৩ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে তেলিয়াপাড়ায় মুখোমুখি যুদ্ধে কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা হতাহত হয়।

সুনামগঞ্জ সদর থানার ভাদেরটেকে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি দলের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রায় দেড় ঘণ্টা যুদ্ধে কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা হতাহত হয়। একজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।

৮ নম্বর সেক্টরের একদল মুক্তিযোদ্ধা ঝিনাইদহের শৈলকুপা থানার আলফাপুর গ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি দলকে আক্রমণ করেন। পাকিস্তানি বাহিনীর কয়েকজন সেনা ও রাজাকার হতাহত হয়। একজন মুক্তিযোদ্ধা আহত হন।

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর দুই, তিন, চার ও আট; স্বাধীনতাসংগ্রামে প্রবাসী বাঙালি, আবদুল মতিন, র‌্যাডিক্যাল এশিয়া পাবলিকেশনস, লন্ডন; পূর্বদেশ, ঢাকা, ১০ সেপ্টেম্বর ১৯৭১; আনন্দবাজার পত্রিকাযুগান্তর, কলকাতা, ভারত, ১০, ১১ ও ১২ সেপ্টেম্বর ১৯৭১

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান

বিজ্ঞাপন