default-image

মুক্তিবাহিনীর গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের ক্র্যাক প্লাটুন ১৯ জুলাই পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর দখলে থাকা রাজধানী ঢাকার তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুঃসাহসিক গেরিলা অভিযান পরিচালনা করে। তারা উলুন পাওয়ার স্টেশন, খিলগাঁও পাওয়ার সাবস্টেশন এবং গুলবাগ পাওয়ার স্টেশনে অভিযান চালায়।

রাত ৯টার দিকে ক্র্যাক প্লাটুনের গেরিলা মুক্তিযোদ্ধারা রামপুরা–সংলগ্ন উলুনে শহরের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উড়িয়ে দেওয়ার কাজ শুরু করে। সঙ্গে করে নিয়ে যাওয়া ২০ পাউন্ড প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ, ডেটোনেটর ও ফিউজ দিয়ে অল্প কয়েকজন গেরিলা সফলতার সঙ্গে অভিযানটি সম্পন্ন করেন। সেখানে পৌঁছে তাঁরা পুলিশ ও গার্ডদের ফাঁকি দেন। একই সময় একজন কমান্ডো টেলিফোন লাইন বিচ্ছিন্ন করেন। তাঁরা ১৭ পুলিশকে বন্দী করে অপারেটরকে তাদের ট্রান্সফরমার রুমে নিয়ে যেতে বাধ্য করেন। গেরিলারা এক্সপ্লোসিভ বসিয়ে ট্রান্সফরমার উড়িয়ে দেন। বাকি দুটি দল প্রায় একই সময়ে খিলগাঁও সাবস্টেশন ও গুলবাগ পাওয়ার স্টেশন বিস্ফোরক দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করেন।

উলুন অপারেশনে অংশ নেন গাজী গোলাম দস্তগীর (বীর প্রতীক), মতিন এক ও মতিন দুই, নীলু, জিন্নাহ ও হাফিজ (দস্তগীর ছাড়া বাকি সবাই পরে শহীদ হন)। খিলগাঁও ও গুলবাগ অপারেশনে অংশ নেন পুলু, সাইদ, জুয়েল (পরে শহীদ ও বীর বিক্রম), হানিফ, মূখতার, মোমিন, মালিক ও বাসার। খিলগাঁও অপারেশনে তাঁদের সহযোগিতা করেন নির্বাহী প্রকৌশলী নজরুল ইসলাম (পরে শহীদ)।

বিজ্ঞাপন

মুজিবনগরে বাংলাদেশ সরকারের একজন মুখপাত্র জানান, বাংলাদেশের বিভিন্ন অংশে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণ শুরু করার প্রস্তুতি হিসেবে বাংলাদেশের মুক্তিফৌজের নাম এখন থেকে ‘মুক্তিবাহিনী’। ব্যাপক আক্রমণের জন্য মুক্তিবাহিনীর বিমান ও নৌবাহিনী গঠনের চেষ্টা চলছে।

মুজিবনগরে ঘোষণা করা হয়, বাংলাদেশ ক্রীড়া সমিতির তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ ফুটবল একাদশ ২৫ জুলাই কৃষ্ণনগর স্টেডিয়ামে নদীয়া জেলা দলের সঙ্গে চ্যারিটি ম্যাচ খেলবে। এ খেলা থেকে সংগৃহীত অর্থ বাংলাদেশ মুক্তিসংগ্রাম তহবিলে দেওয়া হবে।

বঙ্গবন্ধুর বিচার, ইয়াহিয়ার হুমকি

ফিন্যান্সিয়াল টাইমস থেকে ইয়াহিয়াকে উদ্ধৃত করে বিবিসির খবরে বলা হয়, শিগগিরই সামরিক আদালতে গোপনে শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার হবে। শেখ মুজিব উকিলের সাহায্য পেতে পারেন, তবে বিদেশি কোনো উকিল নয়। শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে, তাতে মৃত্যুদণ্ডের বিধান ছিল। এ মামলার রায় পর্যালোচনা করার একমাত্র ক্ষমতা ছিল প্রেসিডেন্টের।

ভারত বাংলাদেশের কোনো অংশ অধিকার করতে চাইলে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান যুদ্ধ ঘোষণা করবেন বলেও বিবিসি জানায়। এ ধরনের যেকোনো চেষ্টাকেই পাকিস্তানের ওপর আক্রমণ বলে মনে করা হবে।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে উদ্ধৃত করে বিবিসি আরও জানায়, বিদেশি বিভিন্ন সরকারের মধ্যস্থতার প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে নাকি ইয়াহিয়া খান যেকোনো দিন যেকোনো স্থানে দেখা করার প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু ইন্দিরা তাতে সম্মত হননি।

রবিশঙ্কর–হ্যারিসনের যৌথ উদ্যোগ

বিটলসশিল্পী জর্জ হ্যারিসনের ম্যানেজারের একজন মুখপাত্র নিউইয়র্কে সাংবাদিদের জানান, বাংলাদেশের শরণার্থীদের সাহায্যার্থে হ্যারিসন ‘বাংলাদেশ’ নামে একটি গান রেকর্ড করেছেন। গানটিতে বাংলাদেশের শরণার্থীদের দুঃখ-দুর্দশা বর্ণনা রয়েছে। ২৩ জুলাই গানটি বিভিন্ন রেডিও স্টেশনে বাজানো হবে। বাজারে বিক্রি হবে ২৬ জুলাই থেকে। সেদিন একই সঙ্গে সেতারশিল্পী পণ্ডিত রবিশঙ্করেরও রেকর্ড প্রকাশিত হবে। এসব রেকর্ড বিক্রির টাকা যাবে রবিশঙ্কর ও জর্জ হ্যারিসনের বিশেষ ত্রাণ তহবিলে। ইউনিসেফের মাধ্যমে সে অর্থের বিলি–ব্যবস্থা করা হবে। শরণার্থী শিশুদের জন্য একটি তহবিল গড়ে তোলার জন্য তাঁরা ১ আগস্ট একটি কনসার্টেরও আয়োজন করছেন।

ভারতের কেন্দ্রীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিং সংসদের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণের ওপর নির্মম অত্যাচার চালানোয় পাকিস্তানের সামরিক জান্তাকে উৎসাহ দেওয়ার অভিযোগ করে বলেন, পাকিস্তানকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমাগত অস্ত্র সরবরাহ ভারতের নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক।

বিজ্ঞাপন

রাজ্যসভার সদস্যরাও যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে অস্ত্র সরবরাহ করতে থাকায় গভীর উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেন। সরদার শরণ সিং বলেন, এভাবে অস্ত্র জোগানোর অর্থ হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে গণহত্যাকে ক্ষমার চোখে দেখছে।

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর দুই; ইত্তেফাক, ২০ জুলাই ১৯৭১; আনন্দবাজার পত্রিকা, ভারত, ২০ ও ২১ জুলাই ১৯৭১

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান