default-image

১৪ অক্টোবর সুনামগঞ্জের ছাতকে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর শক্তিশালী একটি দলের সঙ্গে সাহসিকতাপূর্ণ এক সম্মুখযুদ্ধে লিপ্ত হন।

ছাতকের ওপর দিয়ে প্রবাহিত সুরমা নদীর পশ্চিম তীরে ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরি। নদীতীরে গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর। ছাতক শহর থেকে ৩৫ কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণে সিলেট শহর। ছাতক শহর ও সিমেন্ট ফ্যাক্টরি ঘিরে ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর শক্ত প্রতিরক্ষা অবস্থান। এই পুরো এলাকায় ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৩১ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের এক কোম্পানি সেনা। সঙ্গে ১২ আজাদ-কাশ্মীর ফোর্স (একেএফ), ইস্ট পাকিস্তান সিভিল আর্মড ফোর্স (ইপিসিএএফ) এবং রাজাকারদের দুই কোম্পানি শক্তিসমান জনবল।

বিজ্ঞাপন

মুক্তিবাহিনীর জেড ফোর্সের তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ছাতকে আক্রমণ করার জন্য গারো পাহাড়ের তেলঢালা ক্যাম্প থেকে ১১ অক্টোবর ছাতকের ঠিক উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত ঘেঁষে বাঁশতলায় আসে। সেখানে মুক্তিবাহিনীর ৫ নম্বর সেক্টরের সদর দপ্তর।

তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক ছিলেন মেজর শাফায়াত জামিল (স্বাধীনতার পর বীর বিক্রম ও কর্নেল)। তিনি আলফা ও ব্রাভো কোম্পানিকে ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরি এলাকার পাকিস্তানি বাহিনীর মূল অবস্থানে আক্রমণ পরিচালনার দায়িত্ব দেন। গাইড ও সহযোগী হিসেবে তাঁদের সঙ্গে যুক্ত করা হয় ৫ নম্বর সেক্টরের গণবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধাদের। এ ছাড়া রৌমারীতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্টুডেন্ট কোম্পানিকে আলফা ও ব্রাভো কোম্পানির রিইনফোর্সমেন্ট ও রিয়ার প্রটেকশনের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

অভিযান চলাকালে দোয়ারাবাজার থেকে এবং সড়কপথে সিলেট শহর থেকে গোবিন্দগঞ্জ হয়ে ছাতক শহরে যাতে পাকিস্তানি বাহিনীর রিইনফোর্সমেন্ট আসতে না পারে, সে জন্য চার্লি ও ডেলটা কোম্পানিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কাট অফ পার্টি হিসেবে চার্লি কোম্পানি দোয়ারাবাজারে এবং ডেলটা কোম্পানি ছাতক ও গোবিন্দগঞ্জের মাঝামাঝি মাধবপুর ও হাসনাবাদ এলাকায় সড়ক ও রেলপথ অবরোধ করে।

১৪ অক্টোবর সকাল থেকেই মূল আক্রমণকারী দল আলফা ও ব্রাভো কোম্পানি এবং একটি এফএফ কোম্পানির সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। দিনভর প্রচণ্ড যুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধাদের মূল দল এগিয়ে ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরির কাছাকাছি টিলার উঁচু স্থানগুলোতে অবস্থান নেয়। আলফা কোম্পানি একপর্যায়ে পাকিস্তানিদের সম্মুখবর্তী অবস্থানের ১০০ থেকে ১৫০ গজের মধ্যে পৌঁছে যায়।

পাকিস্তানি সেনারা পিছু হটে সুরমা নদীর দক্ষিণ পারে ছাতক শহরে চলে যায়।

মুক্তিবাহিনীর তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের আলফা কোম্পানির রিকোয়েললেস রাইফেলের আঘাতে পাকিস্তানিদের অনেক বাংকার ধ্বংস হয়। সন্ধ্যার মধ্যেই আলফা কোম্পানি ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরি এলাকায় ঢুকে পড়ে। ব্রাভো কোম্পানিও ওই পর্যায়ে আলফা কোম্পানির কাছাকাছি গিয়ে অবস্থান নেয়।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ৩৩ বালুচ রেজিমেন্টের আরেকটি কোম্পানি সেনারা বিকেল থেকে দোয়ারাবাজার হয়ে আলফা ও ব্রাভো কোম্পানিকে পেছন থেকে ঘিরে ফেলার চেষ্টা করে। পাকিস্তানিদের এই দলের সঙ্গে অনেক রাত পর্যন্ত প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়।

১৩ অক্টোবর সন্ধ্যার পর লেফটেন্যান্ট এস আই এম নূরুন্নবী খানের (স্বাধীনতার পর বীর বিক্রম ও লেফটেন্যান্ট কর্নেল) নেতৃত্বে ডেলটা কোম্পানি মাধবপুর ও হাসনাবাদের উদ্দেশে রওনা করেছিল। সুরমা নদীর উত্তর তীরে পারকুল গ্রামে তাঁদের পৌঁছাতে ১৪ অক্টোবর ভোর হয়ে যায়। তাঁরা হাসনাবাদ ও মাধবপুর এলাকায় রেল ও সড়কপথ অবরোধ করে অবস্থান নেন।

বিজ্ঞাপন

সকাল ১০টার দিকে পাকিস্তানি বাহিনী ছাতক শহর থেকে এসে ডেলটা কোম্পানির ওপর হামলা চালায়। তাঁরাও পাল্টা হামলা অব্যাহত রাখেন। পাকিস্তানিরা বারবার চেষ্টা করেও ডেলটা কোম্পানির মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান থেকে সরাতে পারছিল না। সন্ধ্যার আগে পাকিস্তানিদের ত্রিমুখী আক্রমণের মুখে ডেলটা কোম্পানির মুক্তিযোদ্ধারা সুরমা নদী পার হয়ে পারকুল গ্রামে গিয়ে প্রতিরক্ষা অবস্থান নেন। পাকিস্তানিরা আর্টিলারি ও মর্টারের গোলা নিক্ষেপ করে পারকুল গ্রামটি ঝাঁঝরা করে দেয়।

এ যুদ্ধ ১৬ অক্টোবর বিকেল পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। ১৫ অক্টোবর সকাল থেকে পাকিস্তানিরা তিনটি হেলিকপ্টারের সাহায্যে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের ওপর মেশিনগানের গুলি চালায়।

ছাতক যুদ্ধে দুই পক্ষেই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। তবে পাকিস্তানিদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল বেশি। তাদের একজন কর্নেলসহ বহু সেনা, একেএফ, ইপিসিএএফ এবং রাজাকার হতাহত হয়। ৪০-৪৫ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ এবং অনেকে আহত হন।

ছাতকের যুদ্ধে যে পাকিস্তানিরা যথেষ্ট বেকায়দায় পড়েছিল, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার সিদ্দিক সালিক তাঁর উইটনেস টু সারেন্ডার বইয়ে সে কথা স্বীকার করেন। এই অভিযানের খবর বিবিসিসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে উল্লেখযোগ্য প্রচার পেয়েছিল।

সীমান্তে পাকিস্তানের সেনাসমাবেশ

ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার রাজনৈতিক কমিটি ১৪ অক্টোবর রাতে দিল্লিতে ভারত সীমান্তে পাকিস্তানের সেনাসমাবেশ নিয়ে পর্যালোচনা করে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বোম্বাই থেকে দিল্লিতে ফিরে আসার অল্প সময়ের মধ্যে এই রাজনৈতিক কমিটির বৈঠক বসে। কমিটিকে জানানো হয়, ভারী অস্ত্রসজ্জিত পাকিস্তানি সেনারা ভারতের পূর্ব সীমান্তজুড়ে প্রস্তুত হয়ে আছে। পশ্চিমাঞ্চলের পাঞ্জাব, রাজস্থান এবং জম্মু ও কাশ্মীর সীমান্তেও পাকিস্তান ট্যাংক, কামান ও সেনা জড়ো করছে। বৈঠকের পর একজন কর্মকর্তা বলেন, ভারত যুদ্ধ শুরু করবে না, তবে আক্রান্ত হলে জবাব দেবে।

ভারতে সফররত ব্রিটিশ সাংবাদিক ও গ্রন্থকার জন গ্রিগ এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেন, ব্রিটেনে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত ভালো। তবে যুক্তরাজ্য সরকার কী করবে, তা নির্ভর করছে ইন্দিরা গান্ধীর ওপর। তাঁর আগামী সফরে ব্রিটিশ নেতাদের ঠিকমতো বোঝাতে পারলে যুক্তরাজ্য একাই বহু কিছু করতে পারে। গ্রিগ আরও বলেন, এখানে সফরের আগে তাঁর ধারণা অন্য রকম ছিল। কিন্তু এখন তিনি জানেন যে বাংলাদেশ স্বাধীন না হলে শরণার্থীরা দেশে ফিরবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য কর্মকর্তা রবার্ট জে ম্যাকলস্কি সাংবাদিকদের বলেন, পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান কিংবা পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে বিরোধে যুক্তরাষ্ট্র কারও ব্যাপারেই মধ্যস্থতায় রাজি নয়।

সূত্র: সম্মুখযুদ্ধ ১৯৭১: মুক্তিযোদ্ধাদের কলমে, সম্পাদনা মতিউর রহমান, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা; আনন্দবাজার পত্রিকা, কলকাতা, ভারত ১৫ ও ১৬ অক্টোবর ১৯৭১

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান