default-image

জাতিসংঘে চীন সরকারের প্রতিনিধির করা মন্তব্যে দুঃখ প্রকাশ করে বাংলাদেশ সরকারের একজন মুখপাত্র ২১ নভেম্বর মুজিবনগরে বলেন, শরণার্থীদের ব্যাপারে সামান্য সহানুভূতিও প্রকাশ করেনি চীন। শরণার্থীদের সাহায্যের কথা না বলে ভারতের বিরুদ্ধে বিষোদ্‌গার করেছেন চীনের প্রতিনিধি। তবে বাংলাদেশের মানুষ একটি লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে চলেছে। সেটি হলো মাতৃভূমির মুক্তি।
জাতিসংঘে চীনের প্রতিনিধি পাকিস্তানি নীতিকে সমর্থন করায় ভারতের আহমেদাবাদে এক সংবাদ সম্মেলনে দেশটির প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেন, সীমান্তের ঘটনাবলি সম্পর্কে এবং বাংলাদেশের শরণার্থী সমস্যা প্রশ্নে ভারত তার সিদ্ধান্ত নিজেই নেবে।
প্রসঙ্গত, ১৯ নভেম্বর চীনের প্রতিনিধি জাতিসংঘে বক্তব্য দেন।

বিজ্ঞাপন

জাতিসংঘের সমালোচনা

নিউইয়র্ক টাইমস-এ এদিন প্রধান সম্পাদকীয়তে অভিমত ব্যক্ত করা হয়, ভারত উপমহাদেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় জাতিসংঘ কার্যকর ভূমিকা রাখতে চাইলে পূর্ববঙ্গের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সঙ্গে, বিশেষ করে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বোঝাপড়ায় আসতে ইয়াহিয়া খানের ওপর চাপ দেওয়া উচিত। আরও বলা হয়, দৃঢ় সংকল্প নিয়ে উদ্যোগী হলেই কেবল জাতিসংঘ ভারত-পাকিস্তান সীমান্ত থেকে সেনা প্রত্যাহারে সফল হবে। জাতিসংঘ এ পর্যন্ত সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান এড়িয়ে গিয়েছে।
পূর্ববঙ্গে যে মানবিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে, কেবল ত্রাণে তার সুরাহা হবে না বলে মনে করেন প্রিন্স সদরুদ্দিন আগা খানসহ জাতিসংঘের একাধিক কর্মকর্তা। তাঁদের অভিমত হলো, সমস্যার মূলে যেতে হবে। অর্থাৎ পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকটের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। পূর্ববঙ্গে রাজনৈতিক সমাধানের জন্য চাপ দিতে হবে। তবেই সংঘর্ষ বন্ধ হবে এবং শরণার্থীরা নিরাপদে ফিরে যাবে।

যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের কাছে বাংলাদেশ আন্দোলনের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করার জন্য ব্রিটেনের পার্লামেন্ট লেবার পার্টির সদস্য জন স্টোনহাউস এদিন লন্ডন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পথে রওনা দেন। সেখানে একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে তিনি বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে আলোচনা করবেন।
সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির সংবাদপত্র প্রাভদা এদিন তাদের এক সংবাদ নিবন্ধে ক্রেমলিনের অভিমতের পুনরাবৃত্তি করে বলে, পূর্ববঙ্গে সামরিক সরকারের অমানবিক উৎপীড়নের কারণেই জটিল পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। এর দায় ভারতের ঘাড়ে চাপানো যায় না। এ সমস্যার একমাত্র সমাধান রাজনৈতিক মীমাংসা।
পাকিস্তান অধিকৃত ঢাকা থেকে এদিন একটি বার্তা সংস্থা জানায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং অন্য শহরে গেরিলাদের হামলায় পর্যুদস্ত পাকিস্তানিরা দিশেহারা। দেশের অধিকাংশ স্থানে মুক্তিবাহিনী বিদ্যুৎ সরবরাহ চরমভাবে ব্যাহত করেছে। বিস্তীর্ণ পল্লি অঞ্চল মুক্তিফৌজের নিয়ন্ত্রণে। তাদের অভিযানের তীব্রতায় প্রশাসন বেসামাল। পূর্ব পাকিস্তান শিগগিরই হাতছাড়া হতে পারে, এই আশঙ্কায় তারা সন্ত্রস্ত।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর সহায়তায় প্রচণ্ড যুদ্ধের মধ্য দিয়ে মুক্তিবাহিনী এদিন জকিগঞ্জ ও আটগ্রাম মুক্ত করে। যুদ্ধে বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকার নিহত হয়। ৬ জন সেনা, ২ জন পুলিশ ও ২৩ জন রাজাকার আত্মসমর্পণ করে।

বিজ্ঞাপন

যুদ্ধে ভারতীয় সেনাবাহিনীর একজন সেনা কর্মকর্তাসহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ এবং কয়েকজন আহত হন।
৮ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা যশোরের শার্শার বেনাপোল, নাভারন, শার্শা শহরসহ চৌগাছার গরিবপুরে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক আক্রমণ শুরু করেন। ভারতীয় সেনাবাহিনী ট্যাংক ও কামান দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করে। ভয়াবহ যুদ্ধে দুই পক্ষেই বেশ ক্ষয়ক্ষতি হয়।
৬ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক উইং কমান্ডার মোহাম্মদ খাদেমুল বাশারের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী এদিন সকালে কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীর রায়গঞ্জে কামান ও আর্টিলারি দিয়ে আঘাত হানে। বিপর্যস্ত পাকিস্তানি সেনারা পাঁচ মাইল দূরে নাগেশ্বরীতে চলে যায়। এরপর শহীদ আশফাকুস সামাদসহ অন্য শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের মরদেহ উদ্ধার করে জয়মনিরহাট মসজিদের পাশে সমাহিত করা হয়। স্বাধীনতার পর সামাদকে বীর উত্তম খেতাবে সম্মানিত করা হয়। স্থানীয়রা জয়মনিরহাটের নাম রাখেন সামাদনগর।

পাকিস্তানের তৎপরতা

পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো এদিন করাচিতে বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে সম্প্রতি যেভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, তাতে তাঁর সেখানে যাওয়ার আর কোনো আবশ্যকতা নেই।
পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রধান নুরুল আমিন রাওয়ালপিন্ডিতে বলেন, গণতন্ত্রই শুধু দেশের স্থায়িত্ব সুনিশ্চিত করতে পারে। একনায়কতন্ত্র বা স্থায়ী সামরিক শাসন কোনো সমাধান হতে পারে না।
সূত্র: স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রবাসী বাঙালি, আবদুল মতিন, র‌্যাডিক্যাল পাবলিকেশন্স, লন্ডন, যুক্তরাজ্য; আনন্দবাজার পত্রিকা, কলকাতা, ভারত, ২২ ও ২৩ নভেম্বর ১৯৭১; দ্য টাইমস, লন্ডন, ২২ নভেম্বর ১৯৭১
গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান