default-image

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গতিবিধি লক্ষ করার জন্য মুক্তিবাহিনীর আট নম্বর সেক্টরের অধীন সুতিপুর প্রতিরক্ষার অগ্রবর্তী এলাকা যশোরের শার্শায় গোয়ালহাটিতে ৫ সেপ্টেম্বর নিয়োজিত ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের একটি পেট্রল দল। দলের অধিনায়ক ছিলেন ইপিআরের সাবেক সদস্য নূর মোহাম্মদ শেখ। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এই দলের অবস্থান টের পেয়ে যায়। তারা দ্রুত তিন দিক থেকে তাদের ওপর আক্রমণ চালায়। অবস্থার গুরুত্ব বুঝতে পেরে নূর মোহাম্মদ সহযোদ্ধাদের নিয়ে পাল্টা আক্রমণ শুরু করেন, কিন্তু বুঝতে পারেন, পাকিস্তানি সেনাদের সামনে বেশিক্ষণ টেকা যাবে না। মূল প্রতিরক্ষা অবস্থানের নিরাপত্তার জন্য তাঁরা পিছু হটতে চেষ্টা করেন। এ সময় সহযোদ্ধা নান্নু মিয়া গুলিতে আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তাঁকে কাঁধে নিয়ে নূর মোহাম্মদ গুলি করতে করতে পেছনে সরে আসছিলেন। হঠাৎ দুই ইঞ্চি মর্টারের গোলার আঘাতে তাঁর ডান পায়ের হাঁটু চুরমার হয়ে যায়।

বিপর্যয়কর এই অবস্থায় নূর মোহাম্মদ শেখ সহযোদ্ধা মোস্তফা কামালকে নির্দেশ দেন, আহত নান্নু মিয়াকে কাঁধে করে নিয়ে পেছনে সরে যেতে। আর তাঁদের কাভার করার দায়িত্ব তুলে নেন নিজের হাতে। মোস্তফা কামাল তাঁকে ফেলে যেতে রাজি ছিলেন না। নূর মোহাম্মদ জোর করে তাঁদের ফেরত পাঠান। এর পর একাই লড়াই করতে করতে নূর মোহাম্মদ শেখ শহীদ হন। মূল প্রতিরক্ষা অবস্থানের মুক্তিযোদ্ধারা পরে এসে তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার করে যথাযথ মর্যাদায় সমাহিত করেন। স্বাধীনতার পর নূর মোহাম্ম শেখকে বীরশ্রেষ্ঠ উপাধি দেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপন
default-image

ক্ষমতার ভারসাম্যে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন

বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ৫ সেপ্টেম্বর স্বাধীন বাংলা বেতারে একটি ভাষণ দেন। ভাষণে তিনি বঙ্গবন্ধুর বিচারকে প্রহসন বলে উল্লেখ করেন। জলে-স্থলে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের অসামান্য সাফল্যের বিবরণ দিয়ে বলেন, পশ্চিম পাকিস্তানে ক্ষমতার ভিত্তিতে ভাঙন ধরেছে এবং বাংলাদেশে সামরিক শাসকচক্রের মুষ্টিমেয় নিরাপদ এলাকার ওপর নিয়ন্ত্রণ শিথিল হয়ে এসেছে।

তাজউদ্দীন আহমদ বলেন, বিশ্বে ক্ষমতার ভারসাম্যের ক্ষেত্রে সম্প্রতি তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে। এর নবতম প্রমাণ ভারত-সোভিয়েত মৈত্রী চুক্তি। যেসব মহলে আগে শুধু সতর্কতার মনোভাব দেখা দিয়েছিল, সেখান থেকে এখন সমর্থনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

তিনি বলেন, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশন আসন্ন। এই পরিপ্রেক্ষিতে সামরিক জান্তা বাংলাদেশে বেসামরিক শাসন প্রবর্তনের ভান করছে।

তাজউদ্দীন আহমদ বলেন, গত জুলাই মাসের সম্মেলনে এমএনএ ও এমপিএরা বাংলাদেশের পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য আবার অবিরাম সংগ্রামের প্রতিজ্ঞা ঘোষণা করেন। জনপ্রতিনিধিদের বিচার করার হাস্যকর প্রচেষ্টা কিংবা তাঁদের বিষয়সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার প্রয়াস-তাঁদের প্রতিজ্ঞা টলাতে পারবে না।

তাজউদ্দীন আহমদ বলেন, বাংলাদেশের জনগণের অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের বিচারের প্রহসনের বিরুদ্ধে অন্যান্য দেশের সরকার, জনগণ এবং আইন বিশেষজ্ঞসহ নানা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে সক্রিয় করে তোলার সব ধরনের চেষ্টা বাংলাদেশের সরকার ও জনসাধারণ করেছে। শেখ মুজিবের মুক্তির জন্য তাদের কাছে তিনি আবার আবেদন জানান।

তাজউদ্দীন বলেন, তিনি বাংলার অজেয় প্রাণশক্তিতে বিশ্বাসী। তাই তাঁর দৃঢ় প্রত্যয়—ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও যুদ্ধের সর্বনাশের ওপরে বাংলার এই প্রাণশক্তির জয় অবশ্যম্ভাবী।

আবারও অপারেশন ওমেগার অভিযান

অপারেশন ওমেগা দলের স্বেচ্ছাসেবকেরা এই দিন অবরুদ্ধ বাংলাদেশে গেলে আবার পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাদের আটক করে। এর আগে ১৭ আগস্ট পাকিস্তানি বাহিনী এই ত্রাণ সংস্থার সদস্যদের আটক করে এক রাত আটক রেখে পরদিন ভারতে ফেরত পাঠিয়েছিল। অপারেশন ওমেগা ত্রাণসংস্থা ত্রাণসামগ্রীসহ চার সদস্যের আরেকটি দলকে এ দিন বাংলাদেশে পাঠায়। দলের দুজন ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র এবং দুজন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। চারজনের দুজন ছিলেন নারী।

অপারেশন ওমেগার স্বেচ্ছাসেবকেরা এবারও পেট্রাপোল সীমান্ত হয়ে সড়ক পথে দলটি বাংলাদেশের বেনাপোলে প্রবেশ করে। ৪০০ মিটার যাওয়ার পর তিনজন পাকিস্তানি সেনা তাদের পথরোধ করে। কিছুক্ষণ কথা কাটাকাটির পর তিন সেনা ফিরে যায়। দলটি আরও এগিয়ে গেলে কয়েকজন পাকিস্তানি এসে দলটিকে ঘিরে ফেলে। ঘন্টাখানেক বিতর্কের পর সেনারা তাদের সবাইকে ধরে নিয়ে যায়।

নেপাল সফর শেষে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিং কাঠমান্ডুতে সাংবাদিকদের বলেন, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের আসন্ন অধিবেশনে ভারত অবশ্যই বাংলাদেশ ও সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো জাতিসংঘের কোনো সংস্থায় তুলবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ঘটনাবলি সম্পর্কে ভারতের মনোভাব তিনি নেপালের রাজা ও সরকারের উচ্চপর্যায়ে জানিয়েছেন। নেপালের কাছ থেকে ভারতের অভিমতের পক্ষে আরও বেশি সমর্থন পাওয়া গেছে।

ভারতের কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী জনজীবন রাম মুঙ্গেরে বলেন, বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর হাতে পাকিস্তানি বাহিনীর দারুণ ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করতে হচ্ছে। পাকিস্তানি বাহিনী ভারতের বিরুদ্ধে কোনো অপচেষ্টা শুরু করলে তা অঙ্কুরেই শেষ করার জন্য সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া আছে।

বিজ্ঞাপন

পাকিস্তানের অপতৎপরতা

পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে ৫ সেপ্টেম্বর ঘোষণা করা হয়, মামলায় অভিযুক্ত এমএনএ, এমপিএ এবং সরকারি কর্মকর্তা ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যের ক্ষেত্রে সাধারণ ক্ষমা প্রযোজ্য হবে না।

ইসলামাবাদে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ দিন ভারতের অস্থায়ী হাইকমিশনারকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডেকে নিয়ে দিল্লিতে বাংলাদেশ মিশন স্থাপনের অনুমতি দেওয়ার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে একটি নোট দেয়।

গেরিলা অভিযান

আট নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল এই দিন কুষ্টিয়ার বংশীতলা আখ ক্রয় কেন্দ্রের পাশে পাকিস্তানি সেনাবোঝাই কয়েকটি ট্রাককে আক্রমণ করে। এরপর দুই পক্ষের তুমুল যুদ্ধে বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন ১১ জন। এটি বংশীতলার যুদ্ধ নামে খ্যাত।

এক নম্বর সেক্টরের অধীন আরেকদল মুক্তিযোদ্ধা চট্টগ্রাম শহরের দিকে অগ্রসর হলে মীরসরাই এলাকায় কয়েক দফায় রাজাকার ও পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধ হয়। এতে কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকার হতাহত হয়।

বরিশালে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি গোপন আস্তানায় পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকারের সম্মিলিত একটি দল অতর্কিতে হামলা চালায়। এতে চারজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর এক, আট ও এগারো; পূর্বদেশ, ঢাকা, ৬ সেপ্টেম্বর ১৯৭১; আনন্দবাজার পত্রিকা যুগান্তর, কলকাতা, ভারত, ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭১

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান