default-image

প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টি এবং কূটনৈতিক তৎপরতা শুরুর লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ২১ এপ্রিল বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীকে বহির্বিশ্বে ও জাতিসংঘে বাংলাদেশ কূটনৈতিক মিশনের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য আবু সাঈদ চৌধুরী জাতিসংঘের মানবাধিকার অধিবেশনে যোগ দিতে একাত্তরের ফেব্রুয়ারি মাসে সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় গিয়েছিলেন। সেখানে থাকা অবস্থায় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুজন ছাত্রের মৃত্যুসংবাদ পান। তাতে বিচলিত হয়ে ১৫ মার্চ ঢাকায় প্রাদেশিক শিক্ষাসচিবের কাছে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন।

২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী যে নির্বিচার গণহত্যা শুরু করে, বিবিসিতে সে খবর শুনে ২৭ মার্চ পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করেন আবু সাঈদ চৌধুরী। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের প্রধান ইয়ান সাদারল্যান্ডের সামনে ব্রিটিশ গণমাধ্যমকে জানান, এই মুহূর্ত থেকে পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। দেশে-দেশে গিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের নিষ্ঠুরতা-নির্মমতার কথা বিশ্ববাসীকে জানানোর ঘোষণা দেন।

বিজ্ঞাপন

বিশ্বনেতাদের প্রতি ভাসানীর আহ্বান

ভাসানী ন্যাপের (ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি) সভাপতি মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী মুক্তাঞ্চল থেকে জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্ট, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন, চীনের চেয়ারম্যান মাও সে-তুং ও প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই, সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বোচ্চ নেতা লিওনিদ ব্রেজনেভসহ আলেক্সি কোসিগিন ও নিকোলাই পদগোর্নি, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট পম্পিদু, ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ, যুগোস্লাভিয়ার প্রেসিডেন্ট মার্শাল টিটো, মিসরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত, আরব লিগের মহাসচিব আবদেল খালেক হাসুনা এবং আরব ঐক্য সংস্থার মহাসচিব দায়লো তেলির কাছে পৃথক বার্তা পাঠান। এসব বার্তায় অবিলম্বে বাংলাদেশের গণহত্যা বন্ধ করার লক্ষ্যে ইয়াহিয়া খানের ওপর চাপ প্রয়োগের জন্য আবেদন জানান। এ ছাড়া বাংলাদেশে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর বর্বরতা অবলোকনের জন্য বিশ্বনেতাদের প্রতি নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক দল পাঠানোর আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের জনগণকে আত্মনিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে সহযোগিতা দেওয়ার আবেদন করেন।

আইরিশ শ্রমিক দলের বৈদেশিক বিষয়ক কর্মকর্তা ড. কোনার ক্রুইজ এই দিনে লন্ডনে বলেন, পূর্ব পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানের নেওয়া ব্যবস্থা সাম্রাজ্যবাদী ও দমনমূলক যুদ্ধের এক দৃষ্টান্ত।

পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার বাংলাদেশের শরণার্থীদের সহযোগিতা করতে ভারতের সব রাজ্যকে এগিয়ে আসার জন্য আহ্বান জানায়। কলকাতায় বাংলাদেশের সমর্থনে লেখক, শিল্পী, শিক্ষাব্রতী ও সমাজসেবী সংঘের এক সমাবেশ হয়। এতে বক্তব্য দেন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জয়নাল আবেদীন, বিচারমন্ত্রী অজিত পাঁজা, শিক্ষামন্ত্রী শান্তি দাশগুপ্ত, স্বায়ত্তশাসনমন্ত্রী মহম্মদ রউফ এবং রাষ্ট্রমন্ত্রী (পরিকল্পনা) রথীন তালুকদার। আলোচনা করেন প্রবোধকুমার সান্যাল, বিজনবিহারী ভট্টাচার্য, আশুতোষ ভট্টাচার্য, দক্ষিণারঞ্জন বসু, সন্তোষকুমার ঘোষ, রঞ্জিত সেন প্রমুখ। সভাপতিত্ব করেন মনোজ বসু এবং স্বাগত ভাষণ দেন বিনয় সরকার।

পাকিস্তানের ভেতরে-বাইরে

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মেয়ে বেগম আখতার সোলায়মান করাচিতে বিবৃতি দিয়ে বলেন, পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক অভিযান চালানো ছাড়া পাকিস্তান সরকারের আর কোনো বিকল্প ছিল না।

ঢাকায় সাবেক প্রাদেশিক শিক্ষামন্ত্রী মফিজ উদ্দিন আহমদ, মুসলিম লীগ নেতা খান এ সবুর এবং সাবেক স্বতন্ত্র এমপিএ আবদুল মতিন আলাদা পৃথক বিবৃতি দিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করতে সবাইকে আহ্বান জানান।

আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট বুমেদিন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের কাছে পাঠানো এক বার্তায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কার্যক্রমের প্রতি তাঁর সমর্থনের কথা জানান।

বিজ্ঞাপন

নানা স্থানে যুদ্ধ

ক্যাপ্টেন হাফিজ উদ্দিন আহমদের (পরে বীর বিক্রম, মেজর ও মন্ত্রী) নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীর প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ২০ জনের একটি দল রাতে যশোরের নাভারনে পাকিস্তানি সেনাশিবিরে হামলা করে। পাকিস্তানিদের বেশ কয়েকজন এতে হতাহত হয়। মুক্তিযোদ্ধারা আহত হন চারজন। ভারতের স্টেটসম্যান পত্রিকার এক সাংবাদিক এ সময় মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ছিলেন। এ নিয়ে পরে তিনি ‘উইথ কমান্ডোজ ইনসাইড বাংলাদেশ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন লেখেন।

চট্টগ্রাম থেকে আসা পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে মিরসরাই ও মস্তাননগরের পতনের পর মুক্তিযোদ্ধারা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে হিঙ্গুলি সেতু উড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এই দিন পূর্বাঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধারা ডিনামাইট দিয়ে সেতুটি ধসিয়ে দেন। প্রথমবার ব্যর্থ হওয়ার পর রাত সাড়ে তিনটায় দ্বিতীয়বারের প্রচেষ্টায় সেতুটি ধ্বংস হয়।

মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে তীব্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী উত্তরবঙ্গের হিলি, পঞ্চগড় ও কিশোরগঞ্জের দখল নেয়। রাঙামাটির বন্দুকভাঙ্গায় মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে তুমুল যুদ্ধের পর পাকিস্তানি বাহিনী গোয়ালন্দ ঘাট দখল করে। তারা হেলিকপ্টারে করে ফরিদপুরের বিভিন্ন স্থানে ছত্রীসেনা নামায়।

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: দলিলপত্র, দ্বিতীয়, দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ খণ্ড; বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর এক, সাত ও আট; বাংলাদেশ জেনোসাইড অ্যান্ড ওয়ার্ল্ড প্রেস, ফজলুল কাদের কাদেরী; রক্তে ভেজা একাত্তর, মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম, সাহিত্য প্রকাশ; দৈনিক পাকিস্তান, ২২ এপ্রিল ১৯৭১


গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান