default-image

বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ প্রতিনিধি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ২৮ মে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বলেন, বাংলাদেশে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞের পর অখণ্ড পাকিস্তানের ভিত্তিতে আপস করা আর সম্ভব নয়। তবে পশ্চিম পাকিস্তানের কবলমুক্ত হতে বাংলাদেশের ছয় মাস লাগতে পারে, আবার তার বেশিও লেগে যেতে পারে। কিন্তু স্বাধীন গণতান্ত্রিক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ একদিন মাথা তুলে দাঁড়াবেই। ঔপনিবেশিক শৃঙ্খলে চিরদিন বেঁধে রাখা যাবে না।

বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠনের লক্ষ্যে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী জাতিসংঘে নিয়োজিত বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করছিলেন। তাঁদের তিনি এ কথা জানান।

আবু সাঈদ চৌধুরী জাতিসংঘের কর্মকর্তাদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন। পাকিস্তানকে জাতিসংঘের সাহায্য দেওয়ার ব্যাপারে তিনি জাতিসংঘকে সতর্ক করেন।

ভারতে আরও সমর্থন

পশ্চিমবঙ্গের কলকাতা পৌর করপোরেশন বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামীদের স্মরণে সার্কাস অ্যাভিনিউর নাম বাংলাদেশ শহীদ সরণি রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। করপোরেশনের অধিবেশনে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ ছাড়া মেয়রের ত্রাণ তহবিল থেকে বাংলাদেশের শরণার্থীদের জন্য এক লাখ টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

ভারতের মাড়োয়ারি রিলিফ সোসাইটি শরণার্থীদের জন্য সীমান্ত এলাকায় অবিলম্বে ৫০ শয্যার একটি পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল চালুর সিদ্ধান্ত নেয়। ২৪ পরগনা ও নদীয়া জেলার বিভিন্ন স্থানে সোসাইটি পরিচালিত ১২টি শরণার্থীশিবির ও লঙ্গরখানায় প্রায় আড়াই লাখ শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছিল।

বাংলাদেশের শরণার্থীশিবির ঘুরে কলকাতায় এদিন ব্রিটিশ পার্লামেন্টের লেবার পার্টির সদস্য মাইকেল বার্নস বিভিন্ন রাষ্ট্রের কাছে আবেদন জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশ থেকে অবিলম্বে সেনা প্রত্যাহার করা না হলে তারা যেন পাকিস্তানে সব সাহায্য বন্ধ রাখে। সেখানে যা ঘটছে তা মোটেই পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ বিষয় হতে পারে না। এত বিপুল পরিমাণ শরণার্থী-সমস্যার সমাধান শুধু আন্তর্জাতিক পর্যায়েই সম্ভব। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের সংগ্রামে যুক্তরাজ্যের জনগণের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে।

ইন্দিরা গান্ধীকে রিচার্ড নিক্সন

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ২৮ মে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে একটা চিঠি লেখেন। তাতে জানান, পাকিস্তানের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের উদ্দেশ্যে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানকে রাজনৈতিক সমঝোতায় রাজি করাতে চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র।

ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট সুহার্তো ইয়াহিয়া খানকে লেখা চিঠিতে বলেন, তিনি পূর্ব পাকিস্তানের ব্যাপারে পাকিস্তানের নীতি সমর্থন করেন।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি হেমডিক ফ্যানডং কুষ্টিয়া সফর শেষে ফিরে রিপোর্টে লেখেন, ‘শহরটি যেন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর বোমায় ধ্বস্ত জার্মান শহরগুলোর মতো।’

অবরুদ্ধ বাংলাদেশে

একটি পাকিস্তানি সেনাদল ভূরুঙ্গামারীতে তীব্র আক্রমণ করে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে এই দিন এলাকাটির নিয়ন্ত্রণ নেয়। মুক্তিযোদ্ধারা আসাম সীমান্তের গোলকগঞ্জের সোনাহাট সীমান্তসংলগ্ন মুক্ত এলাকা সোনাহাট এবং পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার সাহেবগঞ্জ সীমান্তে আশ্রয় নেন।

বরিশালের হিন্দুপ্রধান এলাকা কলসকাঠিতে পাকিস্তানি সেনারা আক্রমণ করে। শ খানেক পাকিস্তানি সেনা দুটি লঞ্চে করে এসে গ্রামটি ঘিরে ফেলে। এরপর বাড়ি বাড়ি থেকে হিন্দুধর্মাবলম্বী পুরুষদের কলসকাঠি বন্দরে একত্র করে প্রায় ৮৭ জনকে হত্যা করে।

মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল কুমিল্লা-ব্রাহ্মণবাড়িয়া সড়কে মনোহরপুর এলাকায় অ্যামবুশ করলে কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা হতাহত হয়। আক্রান্ত পাকিস্তানি সেনারা পিছু হটে সংগঠিত হয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণের চেষ্টা চালায়। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা এর আগেই নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। পাকিস্তানি সেনারা তখন মনোহরপুর ও পাশের মাগুরা গ্রামে আগুন দেয়।

২৮ মে সকালে একদল মুক্তিযোদ্ধা কুমিল্লার দক্ষিণে রাজারমার দীঘিতে পাকিস্তানি সেনাঘাঁটিতে আক্রমণ করে একটি বাংকার উড়িয়ে দেয়। এ অভিযানে বেশ কিছু অস্ত্র ও গোলাবারুদ মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে আসে।

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর দুই ও সাত; দৈনিক পাকিস্তান, ২৯ মে ১৯৭১; আনন্দবাজার পত্রিকা, ভারত, ২৯ ও ৩০ মে ১৯৭১।

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান