বিজয় দিবস-১৬ ডিসেম্বর
১৪ ডিসেম্বরের আরেক অধ্যায়
১৯৭১-এর ১৪ ডিসেম্বর আমাদের কাছে পরিচিত বুদ্ধিজীবী হত্যা দিবস হিসেবে। কিন্তু এ দিন আরও একটি ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছিল, যা পাকিস্তানি বাহিনীর অধিনায়ক জেনারেল নিয়াজিকে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। এ ঘটনায় জড়িত ছিলেন ভারতীয় বিমানবাহিনীর ২৮ নম্বর স্কোয়াড্রনের উইং কমান্ডার বিষ্ণু ও তাঁর দল, আন্তর্জাতিক রেডক্রসের সেভন ল্যামপেল ও তাঁর দল এবং পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ডা. মালেক ও তাঁর মন্ত্রিপরিষদ। ঘটনাস্থল গভর্নর হাউস, বর্তমান বঙ্গভবন। সময় দুপুর ১২টার ১৫-২০ মিনিট আগে-পরে।
প্রথম পর্ব
১৯৭১-এর স্বাধীনতাযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্ব শুরু হয় ৩ ডিসেম্বর। এর দিনকয় আগে, অর্থাত্ ২২ নভেম্বর ভারতীয় বাহিনী মিত্রবাহিনীর ভূমিকায় এগিয়ে আসে। এ দিন থেকে তারা প্রকাশ্যে সরাসরি স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশ নেয় এবং চারদিক থেকে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থিত পাকিস্তানি বাহিনীকে আক্রমণ করে। যুদ্ধের শুরুতেই ভারতীয় বিমানবাহিনী তেজগাঁও বিমানবন্দরকে অকার্যকর করে দেয় এবং পাকিস্তান বিমানবাহিনীকে সম্পূর্ণভাবে নিষ্ক্রিয় করে আকাশে তাদের নিরঙ্কুশ আধিপত্য বিস্তার করে। ভারতীয় বিমানবাহিনী ১৪ দিনের যুদ্ধে কোনো বাধা বা ভয়ভীতি ছাড়া স্বাধীনভাবে পূর্ব পাকিস্তানের যেখানে ইচ্ছা আক্রমণ করতে থাকে।
১৪ ডিসেম্বর দুপুরে ঢাকায় গভর্নর হাউসে গভর্নরের নেতৃত্বে প্রাদেশিক মন্ত্রিপরিষদের সভা বসবে—ভারতীয় গোয়েন্দারা বিষয়টি জেনে যায়। দিল্লিতে বিমানবাহিনীর সদর দপ্তরকে তা জানানো হয়। দিল্লি থেকে সঙ্গে সঙ্গেই শিলংয়ে অবস্থিত ইস্টার্ন এয়ার কমান্ডকে তা জানানো হয় এবং গভর্নর হাউসে বিমান আক্রমণের নির্দেশ দেওয়া হয়। বেলা আনুমানিক ১১টায় উইং কমান্ডার ভূপেন্দ্র কুমার বিষ্ণু ময়নামতি সেনানিবাসে (কুমিল্লা) বিমান আক্রমণ শেষ করে শিলং এয়ারবেসে ফেরত এসেছেন। উইং কমান্ডার বিষ্ণু ভারতীয় বিমানবাহিনীর ২৮ নম্বর স্কোয়াড্রনের কমান্ডার ছিলেন। ২৮ নম্বর স্কোয়াড্রনে ছিল সদ্য কেনা ভারতের প্রথম সুপারসনিক যুদ্ধবিমান মিগ-২১। প্রতিটি মিগ ২১-এ ছিল ৩২টি করে উচ্চ স্তরের ধ্বংসক্ষমতাসম্পন্ন রকেট।
বেস কমান্ডার গ্রুপ ক্যাপ্টেন উলেন উইং কমান্ডার বিষ্ণুকে একটি জরুরি ও জটিল অভিযানের জন্য প্রস্তুত হতে বললেন। টার্গেট ঢাকা সার্কিট হাউস। তাঁকে আরও জানানো হয় যে সেখানে গুরুত্বপূর্ণ সভা চলছে। ১১টা ৫০ মিনিটের মধ্যে টার্গেটে পৌঁছাতে হবে। বিষ্ণুর ঘড়িতে তখন ১১টা ২৫।
ঢাকা পৌঁছাতে লাগবে ২১ মিনিট। বিষ্ণু টার্গেটের অবস্থান জানতে চাইলে উলেন ঢাকার একটি ট্যুরিস্ট ম্যাপে বিষ্ণুকে সার্কিট হাউসের মোটামুটি অবস্থান দেখিয়ে দেন। বিষ্ণু উলেনের কাছ থেকে ম্যাপটি ধার করে দ্রুত স্কোয়াড্রনে চলে আসেন। এই মিশনের জন্য বিষ্ণু আরও তিনজনকে নির্বাচন করেন; তাঁরা হলেন ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট বিনোদ ভাটিয়া, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট রাঘবচারিয়া ও ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মালি।
উইং কমান্ডার বিষ্ণু তাঁর মিগ-২১ চালু করে ওড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, এমন সময় একজন ফ্লাইট কমান্ডার দৌড়ে এসে বিমানের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁকে একটি কাগজ দিলেন। তাতে লেখা, টার্গেট সার্কিট হাউস নয়, গভর্নর হাউস। বিষ্ণু বিমানের ভেতর থেকেই পত্রবাহককে ইশারায় জানিয়ে দিলেন, নির্দেশটি তিনি বুঝতে পেরেছেন। বিষ্ণু দ্রুত তাঁর কোলে রাখা ঢাকার ট্যুরিস্ট ম্যাপ থেকে গভর্নর হাউসের অবস্থান দেখে নিলেন। নিরাপত্তার স্বার্থে বিষ্ণু সঙ্গী বিমানচালকদের তখনো টার্গেট সম্পর্কে কিছু বলেননি। চারটি বিমান একত্রে ঢাকার উদ্দেশে শিলং বিমানবন্দর ছেড়ে উড়াল দিল। বিমানের গতি ঘণ্টায় প্রায় ৮০০ কিলোমিটার। ঢাকা পৌঁছাতে এক মিনিট বাকি থাকতে বিষ্ণু সঙ্গীদের টার্গেটের বর্ণনা দিলেন এবং শনাক্ত করার সঙ্গে সঙ্গে তা জানাতে বললেন। গভর্নর হাউসটি প্রথম দেখতে পান ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট ভাটিয়া। তখন তিনি টার্গেট থেকে মাত্র ৫০০ গজ দূরে।
বিষ্ণুর বর্ণনায় গভর্নর হাউস ছিল অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ এক গম্বুজওয়ালা রাজপ্রাসাদতুল্য একটি স্থাপত্য, চারদিকে তার সবুজের সমারোহ। গভর্নর হাউসের ভেতরে কিছু গাড়িও দেখা যাচ্ছিল। বিষ্ণু টার্গেট সম্পর্কে আরও নিশ্চিত হওয়ার জন্য গভর্নর হাউস ঘিরে একটি চক্কর দিলেন। এরপর উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে পর পর দুবার গম্বুজের নিচের কক্ষে—দরবার হলে—আক্রমণ করলেন। বাকি তিনজনও একইভাবে দরবার হল ও গম্বুজটি টার্গেট করে আক্রমণ করলেন। চারটি বিমানের মোট ১২৮টি রকেটই গভর্নর হাউসকে লক্ষ্য করে ছোড়া হলো। দ্বিতীয় দফায় আক্রমণের সময় বৈমানিকেরা পূর্ব পাকিস্তানের সর্বোচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রাসাদ থেকে ধোয়া আর ধুলা বেরোতে দেখলেন।
দ্বিতীয় পর্ব
সেভন লেমপেল সুইডিশ বিমানবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ১৯৭০ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের সময় রেডক্রস মিশন নিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে আসেন। ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে শুরু হয়ে যাওয়া স্বাধীনতাযুদ্ধের কারণে পূর্ব পাকিস্তান ত্যাগ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেন। ডিসেম্বর মাসে চূড়ান্ত যুদ্ধ শুরু হলে রেডক্রস হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালকে—বর্তমানে হোটেল শেরাটন—নিরপেক্ষ এলাকা বা নিউট্রাল জোন হিসেবে ঘোষণা দিলে সেভন এর দায়িত্ব নেন।
পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ডা. এ এম মালেক ১৪ ডিসেম্বর সকালে সেভনকে গভর্নর হাউসে দেখা করার জন্য খবর পাঠান। এর আগে ১২ ডিসেম্বর গভর্নর মালেক সেভন মারফত প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার কাছে এই বার্তা পাঠান যে যুদ্ধ বন্ধ করার ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য তিনি ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে আলোচনা করতে ইচ্ছুক। দুপুর প্রায় ১২টার দিকে সেভন স্থানীয় দুজন রেডক্রস কর্মীসহ তাঁর ল্যান্ডরোভারে চেপে গভর্নর হাউসের দিকে যাত্রা করেন। গাড়িটি যখন গভর্নর হাউসের কাছাকাছি, তখনই সেভন ভারতীয় বিমানবাহিনীর প্রথম বিমান আক্রমণ লক্ষ করেন। নিরাপত্তার জন্য সেভন আশ্রয় নেন পাশের পার্কে। আক্রমণ শেষ হলে সেভন গভর্নর হাউস এলাকায় প্রবেশ করেন। গভর্নর হাউসের একটা অংশে তিনি আগুন দেখতে পান। এ সময় তিনি দ্বিতীয় বিমান আক্রমণ লক্ষ করেন। এবার তিনি পাশের একটি নিরাপদ স্থানে অবস্থান নেন। সেভন গভর্নর হাউসের গেটে কোনো নিরাপত্তারক্ষী দেখতে পাননি। তাঁরা সোজা গভর্নর হাউসের মূল ভবনে প্রবেশ করে দেখতে পেলেন, গভর্নরের অফিসকক্ষ অক্ষত আছে। গভর্নর ও তাঁর মন্ত্রিপরিষদ সভাকক্ষে বসে আছেন।
সেভন হাজির হওয়ামাত্র কোনো ভূমিকা ছাড়াই গভর্নর ও তাঁর মন্ত্রিপরিষদ রেডক্রসের নিরপেক্ষ এলাকায় আশ্রয় নেওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করল। বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিবেচনা করে তাঁর দলের অপর দুজনের সঙ্গে পরামর্শ করার জন্য সেভন সভাকক্ষের বাইরের করিডরে আসেন। করিডরে তখনো বিমান আক্রমণের উত্তাপ পাওয়া যাচ্ছিল। জায়গায় জায়গায় আগুন ও বারুদপোড়া গন্ধ। তাঁরা সিদ্ধান্ত নিলেন, গভর্নর ও তাঁর মন্ত্রিপরিষদ যদি পদত্যাগ করে এবং পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে সব সম্পর্ক ছেদ করে, তাহলেই তাঁদের নিরপেক্ষ এলাকায় আশ্রয় দেওয়া যেতে পারে। অর্থাত্ নিরপেক্ষ এলাকায় তাঁদের প্রবেশ করতে হবে একেবারে সাধারণ মানুষ হিসেবে। প্রস্তাবটি গভর্নর ও তাঁর মন্ত্রিপরিষদকে জানানো হলে সভাকক্ষে পিনপতন নিস্তব্ধতা নেমে আসে।
বেশ কিছুক্ষণ পর গভর্নর নীরবতা ভঙ্গ করে বলেন, এ ছাড়া তাঁদের আর করারই বা কী আছে? সেভনকে তিনি ধন্যবাদ জানান। সেভন তাঁর নিত্যব্যবহার্য প্যাডটি গভর্নরের দিকে বাড়িয়ে দেন। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টকে উদ্দেশ করে কাঁপা-কাঁপা হাতে গভর্নর তাঁর পদত্যাগপত্র লিখে তাতে স্বাক্ষর করেন। এরপর পদত্যাগপত্রটি তিনি মন্ত্রিপরিষদ সদস্যদের দিকে বাড়িয়ে দেন। তাঁরাও একে একে তাতে স্বাক্ষর করেন। স্বাক্ষর করার সময় কারও হূদয় দুঃখভারাক্রান্ত, কারও চোখে পানি। কেউ স্বাক্ষর করলেন শ্লেষোক্তির সঙ্গে। সর্বশেষ স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তান সরকারশূন্য হয়ে গেল। গভর্নর মালেক পদত্যাগপত্রটি সেভনকে হস্তান্তর করলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে একটি রকেট পাশের দরবারকক্ষে আঘাত হানে। ডা. মালেক ও তাঁর সঙ্গীদের নিয়ে সেভন নিরপেক্ষ এলাকার উদ্দেশে বেরিয়ে এলেন।
শেষ দৃশ্য
একই দিন বিকেলে ডা. মালেক সেভনকে জানান যে কিছুক্ষণ আগে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের একটি বার্তা তাঁর হাতে এসে পৌঁছেছে। সে বার্তায় যুদ্ধ বন্ধ করতে সব ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট তাঁকে অনুমতি দিয়েছেন। সেভন তাঁকে মনে করিয়ে দিলেন যে তিনি আর পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর নন। ডা. মালেক একটি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।
সেভন ভাবলেন, এই বার্তা যথাসময়ে ডা. মালেকের হাতে পৌঁছালে ইতিহাস হয়তো কিছুটা ভিন্নরূপ হতে পারত। হয়তো জেনারেল নিয়াজি আত্মসমর্পণের জন্য আরও কিছুটা সময় নিতেন, হয়তো আরও কিছু নিরপরাধ মানুষের মৃত্যু হতো। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা তা ছিল না। গভর্নরের পদত্যাগের ফলে জেনারেল নিয়াজির দম্ভোক্তি—শেষ বুলেট শেষ সেনা—কর্পূরের মতো উবে গেল। দুই দিনের মাথায়, অর্থাত্ ১৬ ডিসেম্বর তিনি প্রকাশ্যে ভারতীয় বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করলেন।
lutful55@gmail.com
সূত্র:
‘অ্যান ইম্পরট্যান্ট ফুটনোট ইন আওয়ার হিস্টরি’, শামসুল মোর্তজা, দি ডেইলি স্টার, ১৫ ডিসেম্বর ২০০৬
থান্ডার ওভার ঢাকা, এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) বি কে বিষ্ণু
পুনশ্চ:
উইং কমান্ডার বি কে বিষ্ণু পরবর্তী সময়ে এয়ার ভাইস মার্শাল হিসেবে অবসর নেন। আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধে সহযোগিতা করার জন্য তিনি বীরচক্র খেতাবে ভূষিত হন। স্বাধীনতাযুদ্ধে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখার জন্য প্রথম সুপারসনিক ইউনিট হিসেবে ২৮ নম্বর স্কোয়াড্রনকেও রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মানিত করা হয়।
মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেভন ল্যামপেল স্টকহোমে তাঁর অবসর জীবন যাপন করেছেন। রেডক্রসে চাকরির অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা তাঁর এক স্মৃতিকথায় একাত্তরের বাংলাদেশ প্রসঙ্গেরও উল্লেখ রয়েছে। ২০০৭ সালের জুলাই মাসে ৮৬ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
সূত্র: ১৬ ডিসেম্বর, ২০০৮ সালের বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত
Also Read
-
ইরানের নিরাপত্তা প্রধান লারিজানি ও বাসিজ ফোর্সের প্রধান সোলাইমানি নিহত, দাবি ইসরায়েলের
-
যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেভাবে দাবার বোর্ড সাজিয়েছে ইরান ও চীন
-
যুক্তরাষ্ট্রকে ‘শিক্ষা দিতে চাওয়া’ কে এই আলী লারিজানি
-
কোথাও রেশনিং, কোথাও চাহিদামতো তেল মিলছে
-
গত এক দশকে বাংলাদেশে অর্ধেক তরুণ চাকরি পাননি: বিশ্বব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট