বিজয় দিবস-১৬ ডিসেম্বর

মুক্তিযুদ্ধে বুদ্ধিজীবীদের সমন্বয়

কলকাতায় ১৯৭১ সালে এক প্রতিবাদ সমাবেশে (বাঁ থেকে) পটুয়া কামরুল হাসান, জহির রায়হান ও অজয় রায়।

১৯৭১ সালের এপ্রিলের শুরুর দিকে আমি ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে আগরতলা পৌঁছাই। সেখান থেকে কলকাতা। দলে ছিলাম আমরা তিনজন। আমি ছাড়া রেহমান সোবহান আর ড. মোহাম্মদ আনিসুর রহমান। কলকাতায় যাওয়ার পর অধ্যাপক এ আর মল্লিক, শিল্পী কামরুল হাসান, জহির রায়হান, ওয়াহিদুল হক, হাসান ইমান, মওদুদ আহমদ, নিতুন কুণ্ডুসহ অনেকের সঙ্গে দেখা হয়। সবাই মুক্তিযুদ্ধ-সংক্রান্ত নানা কাজে ব্যস্ত। সবার লক্ষ্য ওই একটাই। কীভাবে এ যুদ্ধে সফল হওয়া যাবে।

সেখানে যাওয়ার সময় আমি ঢাকা থেকে বেশ কিছু গানের ক্যাসেট নিয়ে গিয়েছিলাম। টেলিভিশনে আমরা গানের যে অনুষ্ঠানগুলো করতাম, তারই কিছু ক্যাসেট। সেগুলো ওখানে বেশ কাজ দেয়। বিভিন্ন জায়গায় আমরা জাগরণের গানের অনুষ্ঠান করেছি, প্রদর্শনীর আয়োজন করেছি। তবে সবচেয়ে বেশি করেছি পাপেট শো। পাপেট শো করলে শরণার্থী শিবিরে মন খারাপ করে থাকা মানুষগুলোর মুখে সামান্য হলেও হাসি ফুটে উঠত। এটা ছিল অনেক আনন্দের একটা ব্যাপার।

সবাই মিলেই তখন আমরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ শুরু করেছি। কিন্তু কাজগুলো হচ্ছিল আলাদা আলাদাভাবে। তখন এ আর মল্লিক প্রস্তাব দিলেন একটি সংগঠন করার। তা নিয়ে একদিন সবাই আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনা করি। সেদিনই সর্বসম্মতিক্রমে ‘বাংলাদেশ বুদ্ধিজীবী মুক্তিসংগ্রাম পরিষদ’ নামে একটি সংগঠন দাঁড় করানো হয়। এর ইংরেজি নাম হয় ‘লিবারেশন কাউন্সিল অব ইন্টেলিজেনশিয়া’। প্রাথমিক অবস্থায় আমরা সংগঠনের সভা করি মল্লিকদার পার্ক সার্কাসের বাসায়। পরে বাংলাদেশ মিশনের অফিসে।

এর মধ্যে আমি ও ওয়াহিদুল হকসহ অনেকে মহড়া ও নানা ধরনের অনুষ্ঠান নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। তাই সভায় খুব বেশি যাওয়ার সুযোগ হতো না। প্রথম দিকে নিয়মিতভাবে পাঁচ-ছয়টি সভায় গিয়েছিলাম। পরে অনিয়মিত হয়ে যাই। কিন্তু যে কদিনই গিয়েছি, সেই কদিনই তাঁদের নানা পরিকল্পনার কথা শুনেছি। বেশ কিছু কর্মপন্থা ঠিক করা হয়। সেসব বাস্তবায়নেরও পথ খোঁজা হয়। তবে সবকিছুর গোড়ায় ছিল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠন ও অর্থ সংগ্রহের ব্যাপার। দুটোই সমানভাবে চলতে থাকে। মল্লিকদা ও অন্যরা যুক্ত হন বিদেশিদের সঙ্গে যোগাযোগের কাজে। আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়ি বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন নিয়ে।

একটি ঘটনার কথা বলতেই হয়। আমাদের তহবিল গঠনের জন্য জহির রায়হানের জীবন থেকে নেয়া চলচ্চিত্রটি ভারতে প্রদর্শনের পরিকল্পনা করা হয়। কারণ, জহির রায়হান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে স্টপ জেনোসাইড নামে তথ্যচিত্র তৈরি করবেন, সে জন্য অর্থ লাগবে। বাণিজ্যিক প্রদর্শনের আগে আমন্ত্রিত অতিথিদের জন্য চলচ্চিত্রটি প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে সত্যজিত্ রায়ও ছিলেন। আমরা পাশাপাশি বসে সিনেমাটি দেখেছি। সে প্রদর্শনী করা হয়েছিল ‘বাংলাদেশ বুদ্ধিজীবী মুক্তিসংগ্রাম পরিষদ’-এর ব্যানারে।

সে সময় ‘বাংলাদেশ বুদ্ধিজীবী মুক্তিসংগ্রাম পরিষদ’-এর মাধ্যমে সবার জন্য কিছু ভাতার ব্যবস্থা করা হয়। কারণ, আমরা যারা এসব কাজ করছি, তাদের অনেকেরই পরিবার তখন কলকাতায়। ‘বাংলাদেশ বুদ্ধিজীবী মুক্তিসংগ্রাম পরিষদ’ থেকে আমাদের ৫০ বা ১০০ টাকা করে ভাতা দেওয়া হতো। ওই অর্থই তখন আমাদের জন্য যথেষ্ট।

এ কথা বলতে পারি, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে ‘বাংলাদেশ বুদ্ধিজীবী মুক্তিসংগ্রাম পরিষদ’ অনবদ্য ভূমিকা রেখেছিল। এর উদ্যোগে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে বাংলাদেশের শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদের বহু কাজ সমন্বিত ও অর্থবহভাবে সম্পন্ন করা গিয়েছিল।

সূত্র: ১৬ ই ডিসেম্বর, ২০১৩ সালের বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত