বিজয় দিবস-১৬ ডিসেম্বর
‘তখন সত্যি মানুষ ছিলাম’
২০০৫ সালের একটি ঘটনা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে প্রথমবারের মতো আমাকে অন্যভাবে ভাবতে বাধ্য করেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া শেষ করে তখন অনেক তরুণ-তরুণী সেই সময়ের বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশনে কাজ করছিলেন। তাঁদের অনুষ্ঠান পরিকল্পনার চমত্কারিত্ব, প্রযোজনার মুন্সিয়ানা এবং আঙ্গিক বিন্যাসের অন্য আলোয় উদ্ভাসিত দর্শকের একটা রুচিগত পরিবর্তনও ঘটছিল সাড়া ফেলে। সে বছরের ২৫ মার্চ স্মৃতিতে নিয়ে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের বন্ধুপ্রতিম প্রযোজক যখন প্রাথমিক পরিকল্পনা জানালেন, আমি সম্পৃক্ত হলাম সেই উদ্যোগের সঙ্গে। সিদ্ধান্ত হলো, অনুষ্ঠানের নাম হবে ‘কালরাত্রি’।
সাক্ষাত্কারভিত্তিক এই অনুষ্ঠানে যুদ্ধে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও ব্যক্তির বয়ানে আমরা বেদনা ও বিজয়ের কথা তুলে আনব দর্শকের সামনে। অনুষ্ঠানের জন্য সাক্ষাত্কার নেওয়া হলো বীরাঙ্গনা ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী, ইলা মজুমদার, সারা মাহমুদ ও মুহম্মদ জাফর ইকবালের। পণ্ডিত বারীণ মজুমদার ও ইলা মজুমদারের মেয়ে মধুমিতা হারিয়ে যান একাত্তরেই। সারা মাহমুদ শহীদ আলতাফ মাহমুদের স্ত্রী। বীরাঙ্গনা ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী নির্যাতিত হন বন্দিশিবিরে। মুহম্মদ জাফর ইকবাল হারান তাঁর বাবা শহীদ বুদ্ধিজীবী ফায়জুর রাহমানকে। মনে পড়ে, অনুষ্ঠানটির সম্পাদনা শেষে সম্প্রচারের আগে একটুখানি দেখে সহ্য করতে না পেরে টেলিভিশন ভবন ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলাম। অনুষ্ঠানের উপস্থাপক হিসেবে নিজের ত্রুটি আছে কি না, তা যাচাই করতেই দেখতে চাওয়া কিন্তু, তাই বলে এত কষ্ট!
সম্প্রচারের বেশ কয়েক দিন পরে একজন দুর্ধর্ষ মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের সঙ্গে দেখা হলো। পূর্বপরিচিত এই মানুষটি যখন বিভিন্ন আয়োজনে একাত্তরের জনযুদ্ধের গণযোদ্ধাদের কথা বলতেন, খেটে খাওয়া নিম্ন আয়ের সাধারণ মানুষের অসাধারণ বীরত্ব ও অপরিসীম আত্মত্যাগের কথা বলতেন, সমবেত শ্রোতা-দর্শকেরা একই সঙ্গে তখন অগ্নিগমর্ভর মতো জ্বলে উঠতেন এবং সমুদ্রের নোনাজলে ভাসতেন। আমরা বহু আয়োজনে দেশজুড়ে একসঙ্গে ঘুরেচি। উপলক্ষ, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথা কথা ও গানে ছড়ানো। কাঁদানো এবং জাগানো। তো, এবার দেখা হওয়ার পর তিনি থমথমে মুখাবয়ব নিয়ে বললেন, ‘আপনার অনুষ্ঠান দেখেছি। ওই মহিলাকে অনুষ্ঠানে এনে তো আপনি মুক্তিযুদ্ধের ইজ্জত মেরেছেন।’ আমার হতভম্ব চেতনা ও অসার শ্রুতি শুনতে থাকে তাঁর কথা। ‘ওই মহিলার কোনো আত্মসম্মানবোধ আছে? থাকলে কেউ নাতি-নাতনির বয়সীদের সামনে নিজের ধর্ষণের কাহিনি বলে?...’ সেনাবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা এবং মুক্তিযুদ্ধের সামরিক বাহিনীর জাদুঘরের দায়িত্বে থাকা সেই ক্ষিপ্ত মুখাবয়বের দিকে যেই চোখ আমি পেতেছিলাম সেদিন, আজ অবধি সেই চোখ দিয়েই মুক্তিযুদ্ধের পরের বাংলাদেশ দেখছি।
মুক্তিযুদ্ধে রক্তস্নাত বিজয়ের পর ৪৮ বছর অতিক্রান্ত হচ্ছে। এই দীর্ঘ সময়ে কত থানা শহর উপজেলা, মহকুমা শহর জেলা, জেলা শহর বিভাগ হলো। কত নতুন সড়ক, সংযোগ সড়ক, উড়ালসড়ক, প্রমত্তা নদীর বুক চিরে সুদীর্ঘ সড়ক-রেলসেতু হলো। হচ্ছে। বড় শহরগুলোতে আকাশমুখী অপরিকল্পিত আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন উঠল। একদল মানুষ হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হলো। দেশের টাকা পাচার হয়ে বিদেশে গেল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হলো। শিক্ষিত বেকারের সূচক ঊর্ধ্বগামী হতে থাকল।
বিজ্ঞানমনস্কতা ও যুক্তিবাদ খুন হতে থাকল। কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িকতা, ভোগবাদ, স্বার্থপরতার বাইরে যেন আর কোনো স্বর ও ধ্বনি নেই। একটা ধর্ষকামী মনস্তত্ত্বের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর অসম্মান ও নিরাপত্তাহীনতা এখন গা-সওয়া ও স্বাভাবিক। শোষণ ও দুঃশাসন দূর হওয়া দূরে থাক, রাজনৈতিক ও সামাজিক জবরদস্তির থাবায় ছিন্নভিন্ন সমস্ত মানবিক বোধ ও উচ্চারণ। মুক্তিযুদ্ধ এই সবকিছুর অবসান চেয়েই তো সেদিন বিজয়ী হয়েছিল।
রক্তের দাগ না শুকাতেই আমরা ঘাতকদের-বিশ্বাসঘাতকদের ক্ষমা করেছিলাম। উদারতাবাদের নামে আমরা ‘ঘরের শত্রু বিভীষণ’কে পুনর্বাসিত করেছি শ্রেণিস্বার্থে। শ্রেণিস্বার্থেই যদি না হবে, তাহলে চটকলের শ্রমিক মুক্তিযোদ্ধা, লাঙল ফেলে যাওয়া কৃষক মুক্তিযোদ্ধা, আর নিরুপায় ধর্ষিত হওয়া বীরাঙ্গনারা বিষপান বা গলায় দড়ি দিয়ে মরলেন কেন—উপেক্ষায়-নিন্দায়-অনাচারে? আমাদের উদারতাবাদ ও মানবতাবাদ এত অশ্লীল কেন?
এ রকম বহু কান্না ও অসহায়ত্বের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে কথা ছিল, আমাদের উচ্চারণ হবে তীক্ষ্ম-শাণিত-অগ্নিগর্ভ। এখন বাস্তব ঠিক তার উল্টো। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী দেশে এখন আমরা কথা বলি এমন স্বরে, যেন আমাদের দুধের দাঁত পড়েনি। কবি আসাদ চৌধুরী লিখেছেন, ‘নদীর জলে আগুন ছিলো/ আগুন ছিলো বৃষ্টিতে/ আগুন ছিলো বীরাঙ্গনার/ উদাস করা দৃষ্টিতে/...এখন এসব স্বপ্নকথা/ দূরের শোনা গল্প/ তখন সত্যি মানুষ ছিলাম/ এখন আছি অল্প।’ এই ‘অল্প মানুষ’ দিয়ে কিছুই হয় না। ৪৮ বছরে স্বদেশ এখন শ্বাপদের অভয়ারণ্য হয়েছে। তা-ই তো কথা ছিল বোধ হয়।
মাহমুদুজ্জামান বাবু সংগীতশিল্পী
সূত্র: ১৬ ই ডিসেম্বর, ২০১৯ সালের বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত
Also Read
-
নিউমুরিং টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব পেল ডিপি ওয়ার্ল্ড
-
বিদেশ যেতে বাধা, বিমানবন্দরে কী ঘটেছিল তা বললেন সেই তিন নারী
-
পাঠাওয়ের ১ কোটি ৯০ লাখ ব্যবহারকারীর তথ্য ফাঁসের দাবি, পাঠাও বলেছে, কিছু ব্যক্তিগত তথ্য দুর্বৃত্তদের হাতে গেছে
-
খুঁজে পেতে ‘লাইভ লোকেশন’ পাঠিয়েছিল মেয়ে, বাবা গিয়ে দেখেন উদ্ধার হচ্ছে লাশ
-
বসুন্ধরা এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংসদীয় কমিটিতে প্রশ্ন