জাদুঘরটি রয়েছে ফরিদপুরের মধুখালীর রউফনগর গ্রামে
জনপদের যুদ্ধ

দুটি তৈজসপত্র, দুটি পোস্টার এই হলো স্মৃতি জাদুঘর

বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্স নায়েক মুন্সী আব্দুর রউফ ১৯৪৩ সালের মে মাসে জন্মগ্রহণ করেন ফরিদপুরের সালামতপুর গ্রামে (বর্তমান নাম রউফ নগর)। এই গ্রামেই রয়েছে গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরটি। বড় কক্ষটির ভেতরে মুন্সী আব্দুর রউফের ব্যবহার্য চিনামাটির দুটি তৈজসপত্র রয়েছে। এর বাইরে মুক্তিযুদ্ধের দুটি পোস্টার রয়েছে বীরশ্রেষ্ঠদের নিয়ে। বীরশ্রেষ্ঠর স্মৃতি জাদুঘর বলতে এতটুকুই।

সাত বীরশ্রেষ্ঠর একজন শহীদ ল্যান্স নায়েক মুন্সী আব্দুর রউফ। তাঁর নামে ফরিদপুরে হয়েছে গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর। তবে সেটি দর্শনার্থীদের আশা পূরণ করতে পারছে না। বই কমবেশি আছে। কিন্তু জাদুঘরে দুটি তৈজসপত্র ও দুটি পোস্টার ছাড়া কিছুই নেই। এ ছাড়া সেখানে যাওয়ার সড়কটি নদীভাঙনে বিলীন হওয়া, লোকবলসংকটসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত এই গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর।

বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্স নায়েক মুন্সী আব্দুর রউফ গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরটি রয়েছে ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার কামারখালী ইউনিয়নের রউফনগর গ্রামে (পুরোনো নাম সালামতপুর)। এই গ্রামেই ১৯৪৩ সালের মে মাসে জন্মগ্রহণ করেন মুন্সী আব্দুর রউফ। তিনি ১৯৬৩ সালের ৮ মে তৎকালীন ইপিআর (বর্তমানে বিজিবি) বাহিনীতে যোগ দেন। অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। ১৯৭১ সালের ৮ এপ্রিল রাঙামাটির মহালছড়ি নৌপথে বুড়িঘাট এলাকায় পাকিস্তানিদের সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর লড়াইয়ে শহীদ হন মুন্সী আব্দুর রউফ।

গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয় ২০০৭ সালের ১৭ নভেম্বর। জেলা পরিষদের ৬২ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয় ৩ হাজার ৫৩৫ বর্গফুটের স্থাপনাটি। ২০০৮ সালের ২৮ মে এটি উদ্বোধন করা হয়।

গ্রন্থাগারে মোট ৫ হাজার ১৮৮টি বই আছে। বেশির ভাগই মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কিত। বড় একটি কক্ষে পাঠকদের বসার জন্য ৫টি টেবিল ও ৪০টি চেয়ার রয়েছে। ওই কক্ষের ভেতরে মুন্সী আব্দুর রউফের ব্যবহার্য চিনামাটির দুটি তৈজসপত্র রয়েছে। এ ছাড়া বীরশ্রেষ্ঠর স্মৃতিবাহী আর কিছু নেই। এর বাইরে মুক্তিযুদ্ধের দুটি পোস্টার রয়েছে বীরশ্রেষ্ঠদের নিয়ে। বীরশ্রেষ্ঠর স্মৃতি জাদুঘর বলতে এতটুকুই।

গ্রন্থাগারিকের দায়িত্বে আছেন মুন্সী সাইদুর রহমান (৩৩)। তিনি বীরশ্রেষ্ঠর চাচাতো ভাই। বললেন, ‘দর্শনার্থীরা এসে প্রশ্ন রাখেন, গ্রন্থাগার আছে। কিন্তু জাদুঘর কোথায়? আমাদের বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়।’

এত বড় একটি প্রতিষ্ঠান রক্ষণাবেক্ষণে সাইদুর রহমানসহ জনবল মাত্র দুজন। অপরজন হলেন বিপুল মোল্লা (৩৬)। তাঁর পদ দারোয়ান কাম তত্ত্বাবধায়ক। বিপুল ২০০৮ সাল এবং সাইদুর ২০১১ সাল থেকে চুক্তিভিত্তিক কর্মী হিসেবে কাজ করছেন। তাঁদের চাকরি স্থায়ী হয়নি।

এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, কোনো জাতীয় দিবস—এমনকি বীরশ্রেষ্ঠর মৃত্যুবার্ষিকীও এখানে সরকারি উদ্যোগে পালিত হয় না। মৃত্যুদিবসটি পালিত হয় বীরশ্রেষ্ঠর পরিবারের উদ্যোগে। এতে অবশ্য জেলা পরিষদ ও উপজেলা প্রশাসনের অনুদান থাকে।

গ্রন্থাগারে দুটি জাতীয় পত্রিকা রাখা হয়। তা পড়তে দু–চারজন পাঠক প্রতিদিন আসেন। তাঁদের একজন স্থানীয় বাসিন্দা আওয়াল মোল্লা (৬৭)। তিনি বলেন, তাঁর মতো হাতে গোনা কয়েকজন আসেন পত্রিকা পড়তে। অথচ আগে বিভিন্ন স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীরাও আসত। যাতায়াতের সড়কটি ঠিক হলে গ্রন্থাগারে পাঠক বাড়বে বলে মনে করেন তিনি।

সড়কটি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি)। কামারখালী বাজার থেকে রউফনগর গ্রামে গেছে সড়কটি। ১০ বছর ধরে সড়কটির গন্ধখালী এলাকায় মধুমতী নদীর ভাঙন চলছে। ভাঙা প্রায় দেড় কিলোমিটার অংশটি হেঁটেও পার হওয়া কঠিন।

গন্ধখালী এলাকার বাসিন্দা জহুরুল মোল্লা (৭৮) বলেন, দেশের সাত বীরশ্রেষ্ঠর একজন মুন্সী আব্দুর রউফ। তাঁর বাড়িতে যাওয়ার রাস্তাটির এমন অবস্থা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

ফরিদপুর এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী ফারুক হোসেন বলেন, ‘আমি উপজেলা প্রকৌশলীকে নিয়ে ওই সড়ক দেখতে গিয়েছিলাম। রাস্তাটি নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। নদীর পাড় বাঁধা না হলে রাস্তা নির্মাণ করা যাচ্ছে না। নদীর পাড় বেঁধে দিলে আমরা দ্রুত রাস্তা করে দেব।’

পাড় বাঁধার দায়িত্ব পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো)। ফরিদপুর পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী সুলতান মাহমুদ বলেন, অস্থায়ী ব্যবস্থা হিসেবে ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে জিও ব্যাগ ফেলা হবে। দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। পাশাপাশি নদীতীরের সাত কিলোমিটারে বাঁধ দিতে ৪৮১ কোটি টাকার একটি প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে।