স্বাধীনতা দিবস-২৬ মার্চ
সংবিধানের দাবি থেকে স্বাধীনতা
একাত্তরের মার্চের আলোচনা যদি সফলও হতো, তাহলে মুজিব বা ভুট্টো কারও পক্ষে প্রধানমন্ত্রী হওয়া সম্ভব ছিল না। নিয়মিত সংসদ গঠন সম্ভব ছিল না। কারণ নতুন একটি সংবিধান তৈরিই ছিল ঘোষিত লক্ষ্য।
বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটেছিল কালজয়ী রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায়। সেই প্রক্রিয়ার উন্মেষ ঠিক কোন তারিখে, তা হলফ করে বলা কঠিন। বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ছয় দফা ধ্রুবতারা। ধাপে ধাপে গড়ে উঠেছে বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণ, স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতার স্বপ্নসৌধ। পিছিয়ে থাকা মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা চিরন্তন। বাঙালিও মুক্তি চেয়েছিল। মুসলমান নয়, মানুষ হিসেবে। পাকিস্তান আন্দোলনে বাঙালি মুসলমান অংশ নিল মুক্তির চেতনা, তাগিদ ও তাড়না থেকেই। সাতচল্লিশের দেশভাগকে বাঙালি মুক্তির পথ ভেবেছিল। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী তাদের ভুল ভেঙে দেয়। শোষণ, নিপীড়ন, বঞ্চনা তো ছিলই, কিন্তু তার চেয়েও তাদের আরও মারাত্মক মনোভাব ছিল। সেটা হলো পূর্ব পাকিস্তানের জনগোষ্ঠীকে সমমর্যাদা দিতে অস্বীকৃতি। বাঙালি ছিল পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর চোখের বালি, আমেরিকার ইতিহাসের ক্রীতদাস। বাঙালি দেখল, তাদের পরিচয়-সংকট ঘোচেনি। তার জাতিসত্তা আহত। পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকশ্রেণী গণতন্ত্রী নয়। তাই সাতচল্লিশের স্বাধীনতার প্রথম থেকেই তারা কতৃর্ত্বপরায়ণ হয়ে ওঠে। পূর্ব পাকিস্তান তাদের নব্য উপনিবেশ। এই জনগোষ্ঠীকে তারা সংবিধানে কী মর্যাদা দেবে, তা নিয়ে তাদের অস্বস্তি কখনো চাপা থাকেনি।
প্রথম সংবিধান রচনা করতে তাদের নয় বছর কেটে যায়। বলা যায়, সাতচল্লিশের ১৫ আগস্ট ছিল একাত্তরের ২৬ মার্চের যৌক্তিক পরিণতির সূচনা। এ জন্যই মাউন্টব্যাটেন বাংলাদেশের জন্ম দেখেছিলেন, কথাটি প্রচার পায়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব পাকিস্তান আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। এ কথাটিকে অনেকে আড়াল করার চেষ্টা করেন। এটা নিরর্থক। জমিদারি যাঁতাকলে অতিষ্ঠ, অনগ্রসর বাঙালি মুসলমানের জীবনে ধর্মরাষ্ট্র ‘পাকিস্তানে’ টান ছিল না। হাজার মাইল দূরবর্তী সমাজের সঙ্গে তার সাংস্কৃতিক, সামাজিক কিংবা রাজনৈতিক কোনো বন্ধন কখনো ছিল না। বিশ্বসভ্যতায় ধর্মীয় বন্ধন সবচেয়ে ঠুনকো। এই বন্ধনে কেউ কখনো বাঁধা পড়েনি। বাঙালিও পড়েনি।
প্রথম দ্বন্দ্ব ও প্রতিবাদ সংবিধান প্রণয়ন নিয়েই। কায়েদে আযম জিন্নাহর ‘টাইপরাইটারে’, কংগ্রেসের অদূরদর্শিতায় জন্ম নেওয়া পাকিস্তানের ভাঙনের সানাই বাজল। ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচন কেন হয়েছিল? অনেক সময় একটা ধারণাগত ভ্রান্তি বা অসাবধানতা লক্ষ করি। বড় বেশি জোর দিয়ে বলা হয়ে থাকে, মুজিব অবিভক্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছেন, কি চাননি। একাত্তরের মার্চে মুজিব-ইয়াহিয়ার বৈঠকে ‘ক্ষমতা হস্তান্তরের’ কথাটিও খুব জোর পায়। অথচ এর কোনোটিই ঠিক নয়। অনেকে বলেন, বাহাত্তরের সংবিধান তৈরি করার ম্যান্ডেট আওয়ামী লীগের ছিল না। নতুন করে গণপরিষদের নির্বাচন করা দরকার ছিল। এও এক ভ্রান্তি। আসলে সংবিধান থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এসেছে। বিশ্ব ইতিহাসে এরও কেনো তুলনা নেই।
১৯৪৭ থেকে ১৯৫৬। পাকিস্তানে কয়টা প্রদেশ হবে, তা ঠিক করতে পারেনি পশ্চিমারা। পাঁচটি করা ছিল যৌক্তিক। যদি পাঁচটি করে, তাহলে পূর্ব পাকিস্তান বৃহত্তম প্রদেশ হতো। তাই তারা ১৯৫৬-তে দুটো প্রদেশ করে একটি বিকলাঙ্গ সংবিধান বানাল। আবশ্য তাতেও তারা তৃপ্ত ছিল না। তাদের কারণেই ৫৮-তে সাংবিধানিক দুর্ঘটনা ঘটল। সংবিধান নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান আর সন্তুষ্ট হতে পারেনি।
জেনারেল ইয়াহিয়া সংসদ ও সংবিধান বাতিল করেছিলেন। এলএফওর আওতায় সত্তরের নির্বাচন হলো। তার লক্ষ্য ছিল নতুন গণপরিষদ ও সংবিধান তৈরি। ছয় দফার পয়লা দফাতেই আছে সংবিধানের কথা। তাতে বলা হলো, লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে একাটি ফেডারেশন গঠনে সংবিধান অনুমোদিত হতে হবে। কিন্তু তা করতে ইয়াহিয়া-ভুট্টো কেউ রাজি ছিলেন না। সুর একটাই। পূর্ব পাকিস্তানকে ঠেকাও।
একাত্তরের মার্চের আলোচনা যদি সফলও হতো, তাহলে মুজিব বা ভুট্টো কারও পক্ষে প্রধানমন্ত্রী হওয়া সম্ভব ছিল না। নিয়মিত সংসদ গঠন সম্ভব ছিল না। কারণ নতুন একটি সংবিধান তৈরিই ছিল ঘোষিত লক্ষ্য। সুতরাং আমাদের জাতীয় জীবনে ছাব্বিশে মার্চের তাৎপর্য অপরিসীম। অনন্যসাধারণ।
আমাদের জাতীয় জীবনে ২৫ ও ২৬ মার্চ গণহত্যার দুঃস্বপ্ন ছাড়াও এক রাজনৈতিক সাংবিধানিক ও ঐতিহাসিক পরম্পরা।
স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের প্রথম বাক্যেই কিন্তু বলা হয়েছে, ‘যেহেতু একটি সংবিধান প্রণয়নের জন্য সত্তরে অবাধ নির্বাচন হয়।’ যেহেতু তারা কথা রাখেনি। বরং আলোচনারত অবস্থায় তারা একটি অন্যায় ও বিশ্বাসঘাতকতামূলক যুদ্ধ ঘোষণা করে, গণহত্যা শুরু করে। তাই সাড়ে সাত কোটি মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের আইনানুগ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ তারিখে ঢাকায় যথাযথভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান করেন। ২৫ মার্চেই বুদ্ধিজীবী নিধন শুরু হয়েছিল, যাতে সংবিধান তৈরি ও রাষ্ট্রপরিচালনার মতো লোক বাঙালি জাতির না থাকে। জনগণের ম্যান্ডেটেই আমাদের গণপরিষদ হয়েছে। সেই গণপরিষদ আমাদের স্বল্পতর সময়ে নতুন সংবিধান দিয়েছে। তাই বলা যায়, সাংবিধানিক পথে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এসেছে।
২৩ মার্চ ২০১১, ঢাকা
সূত্র: ২৬ মার্চ ২০১১ প্রথম আলোর "স্বাধীনতা দিবস" বিশেষ সংখ্যায় প্রকাশিত
Also Read
-
‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান দিয়ে ধানের শীষে ভোট চাইলেন আওয়ামী লীগের নেতারা
-
রাষ্ট্র পরিচালনায় শরিয়াহর প্রাধান্যসহ ৩০ দফা ইশতেহার ইসলামী আন্দোলনের
-
মতামত জরিপ: আওয়ামী লীগের ভোটারদের ৪৮ শতাংশ এবার বিএনপিকে ভোট দেবেন
-
লক্ষ্মীপুরে ‘ভোটের সিল’ উদ্ধারের ঘটনায় জামায়াত নেতাসহ দুজনের বিরুদ্ধে মামলা
-
সাকিবকে দলে না চাওয়া মানে বোকার স্বর্গে বাস করা, বলছেন সালাহউদ্দীন