শহীদ বুদ্ধিজীবী
শ্রী অখিল চন্দ্র সেন
শহীদ বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী, নেত্রকোনা
পরোপকারী, সদালাপী স্বভাবের মানুষ ছিলেন আইনজীবী শ্রী অখিল চন্দ্র সেন। পাকিস্তানপন্থী মুসলিম লীগের চিহ্নিত কয়েকজন নেতা ও রাজাকার একাত্তরের ৭ আগস্ট রাত ১১টার দিকে নেত্রকোনা শহরের মোক্তারপাড়া এলাকার বাসা থেকে তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। তুলে দেয় পাকিস্তানি সেনাদের হাতে। হানাদার সেনারা অমানবিক নির্যাতন করে গভীর রাতে তাঁকে মোক্তারপাড়া সেতুর ওপর নিয়ে গুলি করে হত্যা করে। মৃতদেহটি ভাসিয়ে দেয় মগড়া নদীতে। স্বজনেরা তাঁর দেহটি আর পাননি।
শহীদ অখিল চন্দ্র সেনের জন্ম ১৮৯৮ সালে নেত্রকোনা সদর উপজেলার কাইলাটি গ্রামে। তাঁর বাবা আনন্দ কুমার সেন ছিলেন জোতদার। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি বড়। অখিল সেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাস করেন। এরপর ওই প্রতিষ্ঠান থেকেই আইনশাস্ত্রে স্নাতক ডিগ্রি নেন। পাঠপর্ব শেষ করে প্রথমে আইন পেশায় না গিয়ে তিনি গৌরীপুর জমিদারদের অধীনে মোক্তারপাড়ায় অবস্থিত কাচারিতে প্রধান সুপারিনটেনডেন্টে হিসেবে যোগ দেন। এরপর তিনি জনহিতকর কাজে নিয়োজিত হন। দেশভাগের আগে তিনি ময়মনসিংহ জেলা পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৬ সাল থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত তিনি নেত্রকোনা পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন। এরপর পুরোদমে আইন পেশায় নিয়োজিত হন।
রাজনীতিসচেতন ও সংস্কৃতিমনা মানুষটির পেশাদারি খ্যাতি তখন তুঙ্গে। এমন সময় শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধর পক্ষে উচ্চকণ্ঠ। একাত্তরের ২৯ এপ্রিল দুপুরে পাকিস্তানি হানাদার সেনারা নেত্রকোনা শহরে প্রবেশ করে। অখিল সেনরা তখন পরিবারের লোকজন নিয়ে সদর উপজেলার মনকান্দিয়া গ্রামে এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। স্থানীয় কিছু চিহ্নিত রাজাকার অখিল সেনকে হত্যার নীলনকশা করে। তাঁর পরিচিত মুসলিম লীগের কয়েক নেতার সঙ্গে যোগসাজশ করে শহরের পরিস্থিতি ভালো জানিয়ে তাঁদের বাসায় ফিরে আসতে খবর পাঠান। নিরাপত্তারও আশ্বাস দেন। পরিচিতজনদের কাছ থেকে এমন খবর পেয়ে সরল বিশ্বাসে অখিল সেন গ্রাম থেকে সপরিবার মোক্তারপাড়ার বাসায় ফিরে আসেন। এর কয়ের দিন পরই ৭ আগস্ট রাতে রাজাকার-আলবদররা বাড়িতে হামলা করে তাঁকে তুলে নিয়ে হানাদার সেনাদের হাতে তুলে দেয়। পাকিস্তানি সেনারা মোক্তারপাড়া সেতুর ওপর নিয়ে হত্যা করে লাশ মগড়া নদীতে ভাসিয়ে দেয়। হানাদার সেনারা একাত্তরে নেত্রকোনার অনেক মুক্তিযোদ্ধা, বুদ্ধিজীবী ও স্বাধীনতাকামী বাঙালিকে ধরে এই সেতুর ওপর হত্যা করে নদীতে লাশ ভাসিয়ে দিয়েছে।
ইতিহাসবিদ আলী আহাম্মদ খান আইয়োবের নেত্রকোনা জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গ্রন্থে শহীদ অখিল চন্দ্র সেনের জীবনী আছে। গ্রন্থটি গতিধারা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে। অখিল চন্দ্র সেন নিঃসন্তান ছিলেন। তাঁর ভাতিজার ছেলে ধৃতব্রত সেন (শহীদ মিহির কুমার সেনের ছেলে) জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁদের পরিবারের চারজনকে হত্যা করা হয়। বাড়িতে রাজাকারদের হামলার পর তাঁরা ভারতে গিয়ে শরণার্থীশিবিরে আশ্রয় নেন। স্বাধীনতার পর দেশে ফেরেন। তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁদের পরিবারের কাছে সমবেদনা জানিয়ে চিঠি ও প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে দুই হাজার টাকা করে অনুদান দিয়েছিলেন।
গ্রন্থনা: পল্লব চক্রবর্তী, নেত্রকোনা
Also Read
-
বিভিন্ন জায়গায় আত্মগোপনে ছিলেন শিরীন শারমিন, লালবাগের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হচ্ছে: ডিবি
-
ইরানিদের জরুরি সতর্কবার্তা দিয়ে ইসরায়েল বলল, ‘ট্রেন থেকে দূরে থাকো’
-
গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে ৭ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা ১১ দলীয় ঐক্যের
-
চট্টগ্রামে মানবতাবিরোধী অপরাধ: হাছান মাহমুদ, নওফেলসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে
-
পবিত্র ঈদুল আজহা কবে, সংযুক্ত আরব আমিরাত কী বলছে