শহীদ বুদ্ধিজীবী
গোলাম মহিউদ্দীন আহমেদ
শহীদ বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিকর্মী, ঝিনাইদহ
প্রতিদিনের মতোই ঘুম থেকে উঠে পরিবারের অন্যদের সঙ্গে গোলাম মহিউদ্দীন আহমেদ বাড়ির পাশের পুকুরে গিয়েছিলেন গোসল করতে। প্রায় সবার হাতেই দাঁত পরিষ্কার করার পাউডার আর দাঁতন। কেউ কেউ পানিতে নেমেছেন, আবার কেউ পুকুরপাড়ে বসে দাঁত পরিষ্কার করছেন। এ সময় স্থানীয় কয়েকজন রাজাকারকে নিয়ে একদল পাকিস্তানি ঘাতক সেনা ওই এলাকা ঘিরে ফেলে। ভয়ে কেউ জঙ্গলে লুকিয়ে পড়েন, কেউ উঠে পড়েন গাছের ডালে। ঘাতকেরা পরিবারের বড় ছেলে গোলাম মহিউদ্দীন আহমেদকে তুলে নিয়ে যায়। গানপাউডার ছিটিয়ে জ্বালিয়ে দেয় তাঁর বাড়িটি।
শহীদ গোলাম মহিউদ্দীন আহমেদ ১৯২১ সালে ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার ভায়না গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম বদরুদ্দীন আহমেদ। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে গোলাম মহিউদ্দীন ছিলেন সবার বড়। তাঁরও পাঁচ সন্তান, এখন দুজন জীবিত। তাঁরা ব্যবসায়ী। মুক্তিযুদ্ধের সময় মহিউদ্দীন আহমেদের পরিবারের সবাই গ্রামের বাড়িতে একসঙ্গেই থাকতেন। মহিউদ্দীন আহমেদের নাম রয়েছে বাংলা একাডেমির শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষগ্রন্থে। পাকিস্তানি ঘাতকেরা তাঁকে একাত্তরের ৭ মে তুলে নিয়ে যায়। তারপর মহিউদ্দীন আহমেদের আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
গত ২৩ এপ্রিল মহিউদ্দীন আহমেদের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। স্থানীয় ভায়না বালিকা বিদ্যালয়ের শিক্ষক ওয়াহিদুজ্জামান জানান, তাঁদের পরিবারের কেউ আর গ্রামে থাকেন না। কেউ ঝিনাইদহ শহরে, কেউ ঢাকায় বসবাস করেন। মহিউদ্দীন আহমেদের পরিত্যক্ত বাড়িটি দেখিয়ে তিনি বলেন, তাঁকে তুলে নেওয়ার সময় ঘাতক সেনারা গানপাউডার দিয়ে বাড়িটি পুড়িয়ে দিয়েছিল।
শিক্ষক ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, মহিউদ্দীন আহমেদ ছিলেন গ্রামের পরোপকারী ব্যক্তি। সামাজিক-সাংস্কৃতিক কাজে তিনি অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর অন্য ভাইয়েরাও গ্রামের মানুষের কল্যাণে কাজ করতেন। তাঁর এক ভাই চিকিৎসক ছিলেন। তিনি গরিবদের বিনা খরচে চিকিৎসা করতেন।
ঝিনাইদহ শহরে বসবাসকারী তাঁর ভাতিজা বোরহান উদ্দীন আহমেদ সেই ঘটনার স্মৃতিচারণা করে বলেন, চাচা মহিউদ্দীনকে তুলে নেওয়ার দৃশ্যটি এখনো তাঁর চোখের সামনে ভাসে। তখন তাঁর বয়স ছিল প্রায় ১৬ বছর। ঘটনার সময় তিনিও পুকুরপাড়ে ছিলেন। ঘাতক সেনাদের দেখে তিনি একটি গাছে উঠে লুকিয়ে ছিলেন।
বোরহান জানান, তাঁদের পরিবারটি আওয়ামী লীগের আদর্শে বিশ্বাসী। কেউ কেউ সক্রিয় রাজনীতি করলেও গোলাম মহিউদ্দীন সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন না। তিনি এলাকার সামাজিক-সাংস্কৃতিক কাজে যুক্ত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি গ্রামের যুবকদের সংগঠিত করে যুদ্ধে যেতে অনুপ্রাণিত করেন। তাঁর ছেলে রেজাউল ইসলামসহ পরিবারের পাঁচজন সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। পরে রেজাউল সম্মুখযুদ্ধে শহীদ হন। এসব কারণে গোলাম মহিউদ্দীন রাজাকারদের কুনজরে পড়েছিলেন। তাঁর মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায়নি। শোনা যায়, ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বিষয়খালী নামক স্থানে তাঁকে হত্যা করা হয়।
গ্রন্থনা: আজাদ রহমান, ঝিনাইদহ
Also Read
-
হরমুজের গভীরে আরেক শক্তিতে নজর ইরানের, এর প্রভাবও হবে দুনিয়াজোড়া
-
ডুয়েটে উপাচার্যের যোগদান ঘিরে সংঘর্ষে আহত ২০, ছাত্রদল–ছাত্রশিবিরের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ
-
মোসলেহ উদ্দিন আহমদ ডিএমপির নতুন কমিশনার
-
এখন প্রমাণিত হচ্ছে, মন্দ কাজগুলো আপনারাই করে মাজারের ওপর দোষ চাপাচ্ছেন
-
সেলফিতে ‘ভি’ চিহ্ন: অজান্তেই কি ফাঁস করছেন নিজের ফিঙ্গারপ্রিন্ট?