শহীদ বুদ্ধিজীবী

আহাদ আলী সরদার

শহীদ বুদ্ধিজীবী, চিকিৎসক, নওগাঁ

আহাদ আলী সরদার

আত্রাই নদ পেরিয়ে পাকিস্তানি হানাদার সেনারা নওগাঁর আত্রাই উপজেলায় প্রবেশ করছে—এ খবর পেয়ে চিকিৎসক আহাদ আলী সরদার তাঁর লাইসেন্স করা বন্দুক নিয়ে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ওদের আধুনিক অস্ত্রের মুখে টিকতে না পেরে সরে আসার চেষ্টা করেন। হানাদাররা তাঁকে গুলি করে হত্যা করে।

ঘটনাটি ঘটেছিল ৫০ বছর আগে একাত্তরের ২৪ জুলাই সকালে। সেদিন পাকিস্তানি সেনারা আত্রাইয়ের ডুবাই গ্রামে হামলা করে আরও ১০ মুক্তিকামী বাঙালিকে গুলি করে হত্যা করে। আজ শনিবার সন্ধ্যায় নওগাঁর সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন একুশে পরিষদ সংগঠনের কার্যালয়ে শহীদ আহাদ আলী সরদার স্মরণে আলোক প্রজ্বালন ও আলোচনার আয়োজন করা হয়েছে।

শহীদ আহাদ আলী সরদার চিকিৎসা পেশার পাশাপাশি আত্রাই উপজেলার বিশা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং বিশা ইউনিয়ন পরিষদের কাউন্সিলর ছিলেন। উপজেলায় মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ছিলেন। এলাকার মুক্তিকামী তরুণ ও যুবকদের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করতেন, মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দিতেন।

শহীদ বুদ্ধিজীবীদের সম্পর্কে তথ্য চেয়ে প্রথম আলোতে বিজ্ঞাপন ছাপা হলে শহীদ আহাদ আলী সরদার সম্পর্কে তথ্য ও ছবি পাঠান একুশে পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা-আল-মেহমুদ। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে তরুণ এই গবেষকের মাঠপর্যায়ে গবেষণাগ্রন্থ রক্তঋণ ১৯৭১: নওগাঁ-তে শহীদ আহাদ আলী সরদারকে নিয়ে তথ্য রয়েছে। তিনি জানান, আহাদ আলী স্মরণে প্রতিবছর তাঁরা আলোক প্রজ্বালন ও আলোচনার আয়োজন করেন।

আহাদ আলী সরদারের জন্ম ১৯২৭ সালে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ডুবাই গ্রামে। বাবা সফরদী সরদার, মা ময়জান বিবি। ১৯৪৬ সালে পতিসর উচ্চবিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। ১৯৪৮ সালে বগুড়ায় তৎকালীন লাইসেন্সশিয়েট মেডিকেল ফ্যাকাল্টিতে এলএমএফ, ১৯৫৩ সালে একই প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি মেম্বার অব মেডিকেল ফ্যাকাল্টি (এমএমএফ) কোর্স সম্পন্ন করে নিজের গ্রামে চিকিৎসা পেশা শুরু করেন। তাঁর সাত ছেলে ও পাঁচ মেয়ে।

শহীদ আহাদ আলীর ছেলে আব্দুর রশিদ সরদার প্রথম আলোকে বলেন, ‘একাত্তরের ২৪ জুলাই সকাল ১০টার দিকে বিশাল একটি নৌকা নিয়ে ৩০-৪০ জন পাকিস্তানি সেনা আত্রাই নদ দিয়ে গ্রামের দিকে আসছিল। বাবা বিপদ টের পেয়ে মা ও অন্য ভাই-বোনদের গ্রামের পাশে মাধুর ভিটা নামের এক জঙ্গলে লুকিয়ে রেখে আসেন। এরপর বাবা দোনলা বন্দুক দিয়ে একটি মোটা গাছের আড়াল থেকে নৌকার তলা লক্ষ্য করে গুলি করতে থাকেন। কিন্তু সেনারা স্বয়ংক্রিয় রাইফেল থেকে অনবরত গুলি চালাতে থাকলে বাবা শহীদ হন। পরে হানাদার সেনারা আমাদের বাড়িসহ গ্রামের বেশ কয়েকটি বাড়ি জ্বালিয়ে দেয়।’

রশিদ আরও বলেন, স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর মায়ের কাছে সহানুভূতি জানিয়ে চিঠি দিয়েছেন ও দুই হাজার টাকার অনুদান দিয়েছেন। কিন্তু শহীদ হিসেবে তাঁর বাবা সরকারি স্বীকৃতি পাননি, এটাই তাঁদের দুঃখ।

গ্রন্থনা: ওমর ফারুক, নওগাঁ