মুক্তিযোদ্ধা

সব প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকি

১৯৭০ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় পাকিস্তানের সামরিক সরকারকে ভীতসন্ত্রস্ত করে তোলে। ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য সামরিক শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়ে ১৯৭১ সালের জানুয়ারিতেই তারা সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা শুরু করে। ফেব্রুয়ারি থেকেই তারা ভারী অস্ত্র ও সেনাদের তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে জড়ো করতে থাকে। মার্চে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান মার্চের মাঝামাঝি আলোচনার নামে ঢাকায় আসেন। কিন্তু তাঁর মূল উদ্দেশ্য ছিল সামরিক প্রস্তুতির জন্য সময় ক্ষেপণ করা। এ রকম একটি জটিল পরিস্থিতিতে কয়েকজন বাঙালি সেনা কর্মকর্তা আক্রান্ত হওয়ার আগে নিজেরাই পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে আক্রমণের পরিকল্পনা করেন। রফিকুল ইসলাম তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন: মুহাম্মদ লুৎফুল হক

রফিকুল ইসলাম বীর উত্তম

রফিকুল ইসলামের জন্ম ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৪৩, চাঁদপুর জেলার নাওড়া গ্রামে। ১৯৬৩ সালের প্রথম দিকে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে ১৯৬৫ সালে কমিশন লাভ করেন। ১৯৭১ সালে তিনি ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের (ইপিআর) চট্টগ্রাম সেক্টর সদর দপ্তরে অ্যাডজুট্যান্ট ছিলেন। ২৫ মার্চ রাত ৮টা ৪০ মিনিটে তিনি ইপিআর সেনাদের নিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। মুক্তিযুদ্ধে তিনি ১ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক ছিলেন। ১৯৭২ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন।

১৯৯০ সালে দেশের প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৬ সালে তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন এবং চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জ শাহরাস্তি নির্বাচনী এলাকা থেকে সাংসদ নির্বাচিত হয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৮, ২০১৪ ও ২০১৮ সালে সাংসদ নির্বাচিত হন।

১৯৭৪ সালে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে এ টেল অব মিলিয়নস বই রচনা করেন। ২০০১ সালে মুক্তির সোপানতলে নামে অপর একটি বই রচনা করেন।

প্রশ্ন: আপনি কখন নিশ্চিত হলেন যে পাকিস্তানের সামরিক সরকার বাঙালিদের ক্ষমতা হস্তান্তর করবে না এবং সামরিক অভিযান আসন্ন?

উত্তর: ২৮ ফেব্রুয়ারি ভারী অস্ত্রশস্ত্রসহ ১০ হাজার টন যুদ্ধসামগ্রী নিয়ে পাকিস্তানি জাহাজ এমভি সোয়াত চট্টগ্রামে এসে পৌঁছে। সেনাবাহিনীতে চাকরি করার অভিজ্ঞতা থেকে আমি বুঝতে পারি যে এই জাহাজ পাকিস্তান থেকে রওনা দেওয়ার আগে অন্তত এক মাস সময় লেগেছে বিভিন্ন পর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিতে, সমরাস্ত্রগুলোকে সংগ্রহ করে বাক্সবন্দী করতে এবং বিভিন্ন স্থান থেকে পরিবহন করে করাচিতে এনে জাহাজ লোড করতে। আরও লক্ষ করলাম যে এমভি সোয়াত পৌঁছানোর পরদিন থেকে পিআইএ এবং সামরিক বিমানে করে সাদা পোশাকে সশস্ত্র সৈনিকদের ঢাকায় আনা হচ্ছে। এই দুটি ঘটনা বিশ্লেষণ করে বুঝতে পারলাম যে বাঙালির বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে গেছে, আর এটা শুরু হয়েছে জানুয়ারি মাসের মাঝামাঝিতে।

প্রশ্ন: আপনি কখন পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সিদ্ধান্ত নেন?

উত্তর: ১ মার্চে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া সংসদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করলেন। এই ঘটনায় আমার আর বিন্দুমাত্র সন্দেহ রইল না যে তারা আমাদের শিগগিরই আঘাত হানবে। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমি যখন নিশ্চিত হবো যে আমি আক্রান্ত হতে যাচ্ছি, তখন আমিই তাদের আক্রমণ করব। আমি শুরুতে এককভাবে এই আক্রমণের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকি। পরে প্রয়োজনীয় ব্যক্তিদের সম্পৃক্ত করি।

প্রশ্ন: আপনি এই পরিকল্পনায় কাদের সম্পৃক্ত করেন?

উত্তর: প্রথমেই আমি ইপিআরে আমার খুব অনুগত, বিশ্বস্ত, সাহসী ও পাকিস্তানিদের প্রতি ক্ষুব্ধ সাত–আটজন বাঙালি জেসিও ও এনসিওর সঙ্গে আলোচনা করি, তারা আমার সঙ্গে একমত পোষণ করেন। এরপর বিষয়টি আমি কাপ্তাই উইংয়ের বাঙালি অফিসার ক্যাপ্টেন হারুন আহমদ চৌধুরীকে অবহিত করি এবং তাঁর সম্মতি লাভ করি। আমি বুঝতে পারি যে আমার পরিকল্পনা সফল করতে হলে সেনাবাহিনীর বাঙালি সৈনিকদের সহযোগিতারও প্রয়োজন হবে। তাই আমি ১১ মার্চ থেকে ১৭ মার্চের মধ্যে ইবিআরসিতে কর্মরত লে. কর্নেল এম আর চৌধুরী, ৮ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর জিয়াসহ বেশ কয়েকজন বাঙালি কর্মকর্তার সঙ্গে কখনো এককভাবে, আবার কখনো কয়েকজনের সঙ্গে একত্রে কয়েকটি সভা করি। তাঁদের আমার পরিকল্পনা অবহিত করি। তাঁরা সবাই আমাকে সমর্থন করেন।

প্রশ্ন: আপনার এই পরিকল্পনার সঙ্গে রাজনৈতিক নেতারা কি সম্পৃক্ত ছিলেন?

উত্তর: আমি পরিকল্পনা করি যে আমি ইপিআর সৈনিকদের নিয়ে যুদ্ধ শুরু করব। কিন্তু জনগণের সমর্থনের জন্য আমাকে রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে নিতে হবে। আমি প্রথমে আওয়ামী লীগ নেতা ডা. জাফরের সঙ্গে যোগাযোগ করি। ডা. জাফরের সাহায্য নিয়ে প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা এম আর সিদ্দিকীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করি। ওনার মাধ্যমে আমি মার্চের প্রথম দিকে বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানিদের আসন্ন আক্রমণ ও আমার পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত করি। আমার বিশ্বাস ছিল, তিনি আমার কথা বিশ্বাস করবেন। কারণ, বঙ্গবন্ধু পূর্ব থেকেই আমাকে পারিবারিকভাবে চিনতেন। তিনি আমাকে প্রস্তুতি চালিয়ে যেতে নির্দেশ দেন। পরবর্তী সময় আমি আরও দুই–তিনবার বঙ্গবন্ধুকে পরিস্থিতির সবশেষ সংবাদ অবহিত করি। শেষে আমি ২১ বা ২২ মার্চে এম আর সিদ্দিকীর মাধ্যমে আবারও বঙ্গবন্ধুকে বার্তা পাঠাই যে ইয়াহিয়ার আলোচনা একটা ভাঁওতাবাজি মাত্র। তাঁদের সামরিক প্রস্তুতি নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করার জন্য তিনি আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। আমি তাঁকে চট্টগ্রামে চলে আসার আহ্বান জানাই এবং বলি, আমরা চট্টগ্রামে স্বাধীনতা ঘোষণা করব। আমি এ–ও জানাই, আমাদের শক্তি দ্বারা আমরা দুই সপ্তাহ চট্টগ্রামকে স্বাধীন রাখতে পারব। এই সময়ের মধ্যে তিনি বহির্বিশ্বে তাঁর ঘনিষ্ঠ বা সহযোগী রাষ্ট্র থেকে আমাদের জন্য অস্ত্র, গোলাবারুদ, রসদ, চিকিত্সাসামগ্রী ইত্যাদি সংগ্রহ করে দেবেন। এম আর সিদ্দিকী ফিরে এসে জানান যে বঙ্গবন্ধু পরে তাঁর সিদ্ধান্ত আমাকে জানাবেন।

প্রশ্ন: আপনার সামরিক পরিকল্পনাটি সম্পর্কে কিছু বলুন?

উত্তর: আমি খুব সহজ একটি পরিকল্পনা করি। আমার পরিকল্পনায় ছিল, প্রথমে চট্টগ্রাম শহর দখল করব। আর কুমিল্লা থেকে পাকিস্তানিরা যাতে কোনো অভিযান চালাতে না পারে, তা নিশ্চিত করব। এই পরিকল্পনা বস্তবায়নের জন্য প্রথমে আমি ইপিআরের অবাঙালি সৈনিকদের নিষ্ক্রিয় বা ধ্বংস করব। এর পর শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে যেমন আগ্রাবাদ রোড, স্ট্র্যান্ড রোড, বাটালি হিল ইত্যাদি স্থানে ভারী অস্ত্র মোতায়েন করব। রেলওয়ে হিলে আমার সদর দপ্তর স্থাপন করব। কুমিল্লা থেকে কোনো সামরিক সাহায্য যেন না আসতে পারে, এ জন্য শুভপুর ব্রিজ ও মহুরী নদীর ওপর ধুমঘাটে প্রতিরক্ষা নেব।

যুদ্ধের শুরুটা আমি করব, অর্থাৎ শহর দখলে নেব। এর পর ৮ম ইস্ট বেঙ্গল সেনানিবাসে অবস্থিত বালুচ রেজিমেন্টের ওপর আক্রমণ চালাবে। এর মধ্যে ইবিআরসির প্রায় ১৮০০ বাঙালি সৈনিকও বালুচ রেজিমেন্টের ওপর আক্রমণ করবে এবং তাদের ধ্বংস করবে। একইসঙ্গে বিওপিতে থাকা ইপিআর সৈনিকেরা চট্টগ্রামে চলে এলে তাঁদের শুভপুর ও ধুমঘাটে নিয়োজিত করব। এভাবে সম্পূর্ণ চট্টগ্রাম আমাদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী আমার বিশ্বস্ত জেসিও-এনসিওদের তাঁদের করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়ে দিই। এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান প্রতিরক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত জেসিও-এনসিওদের পৃথকভাবে আমার জিপে করে নিয়ে গিয়ে সশরীর প্রতিরক্ষা অবস্থানগুলো দেখিয়ে দিই। এসব জেসিও-এনসিও প্রতিটি বিওপিতে শুধু একজনকে পরিকল্পনার কথা জানিয়ে রাখে। যাতে আমার নির্দেশ পেলে পশ্চিমে রামগড় থেকে উত্তরে থানচি হয়ে পূর্বে টেকনাফ, শাহপরীর দ্বীপ ও সেন্ট মার্টিন পর্যন্ত প্রায় ২০–২২টি বিওপি থেকে সবাই একযোগে চট্টগ্রামে চলে আসতে পারে।

যুদ্ধ শুরু এবং বিওপি থেকে চট্টগ্রামে চলে আসার নির্দেশ হিসেবে আমি দুটি সংকেতবার্তা সংশ্লিষ্টদের দিয়ে রাখি। প্রথম সংকেতবার্তা ছিল—‘আমার জন্য কিছু কাঠের ব্যবস্থা করো’। এর অর্থ ছিল প্রস্তুত হও, আধা ঘণ্টার মধ্যে যুদ্ধ শুরু করতে হবে। দ্বিতীয় সংকেত ছিল—‘আমার জন্য কিছু কাঠ নিয়ে শহরে আসো’। এর অর্থ ছিল যুদ্ধ শুরু করো, অবাঙালি সৈনিকদের নিষ্ক্রিয় করো, অস্ত্র-গোলাবারুদসহ তোমাদের নির্ধারত স্থানে পৌঁছে যুদ্ধাবস্থান নাও। গোপনীয়তা বজায় রাখার জন্য ‘কাঠ’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলাম, কারণ, চট্টগ্রামে যাঁরা চাকরি করতেন, তাঁরা সবাই এখানকার কাঠ দিয়ে আসবাব বানিয়ে অন্যত্র নিয়ে যেতেন। তাই কাঠ শব্দে কারও সন্দেহের উদ্রেক হবে না।

৯ বা ১০ মার্চের মধ্যেই আমার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়ে গেলে আমি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করি এবং তাঁকে আমার পরিকল্পনা জানাই এবং তাঁর থেকে দিকনির্দেশনা চাই। এ ছাড়া সেনাবাহিনীর অফিসারদের সঙ্গেও সমন্বয় সাধন করি। আমার পরিকল্পনা অনুযায়ী আমি সব প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকি চূড়ান্ত আক্রমণের জন্য।