বীরত্বসূচক খেতাবপ্রাপ্তদের তালিকা

হাবিবুর রহমান, বীর বিক্রম

  • গ্রাম সাধুর গলগণ্ডা, ইউনিয়ন জামুরিয়া, ঘাটাইল, টাঙ্গাইল।

  • বাবা মো. কলিমুদ্দিন, মা সৈয়দুন্নেছা। স্ত্রী ফরিদা ইয়াসমীন। তাঁর ছয় মেয়ে ও দুই ছেলে।

  • খেতাবের সনদ নম্বর ১৭৫।

  • মৃত্যু ১৯৯৮।

হাবিবুর রহমান

১৯৭১ সালের ৯ আগস্ট রাতে সাতটি ছোট-বড় জাহাজ হঠাৎ টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে ধলেশ্বরী নদীর সিরাজকান্দি ঘাটে নোঙর করে। এ খবর দ্রুত পৌঁছাল স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে। সেখানে মুক্তিযোদ্ধাদের যে দলটি ছিল, তার দলনেতা ছিলেন হাবিবুর রহমান। তাঁরা সবাই কাদেরিয়া বাহিনীর সদস্য। হাবিবুর রহমান জানতে পারেন, নোঙর করা জাহাজে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিপুল পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র রয়েছে। এটা জেনে তাঁরা পুলকিত হলেন। কারণ, তাঁদের উন্নত অস্ত্র নেই। তাঁরা শুধু বুদ্ধি ও কৌশল খাটিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে যুদ্ধ করছেন।

টাঙ্গাইল অঞ্চলে যুদ্ধরত কাদেরিয়া বাহিনীর অধিনায়ক কাদের সিদ্দিকী হাবিবুর রহমানকে জানালেন, ওই জাহাজে আক্রমণ করে অস্ত্রশস্ত্র দখল করতে পারলে ভবিষ্যতে মুক্তিযুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সহজ হবে। এ জন্য তিনি রেজাউল করিমের নেতৃত্বে আরও একটি দলকে তাঁর কাছে পাঠালেন। কাজটা অত সহজ ছিল না। উত্তরে মাটিকাটায় তাঁরা অবস্থান নেন। ১১ আগস্ট বেলা ১১টার দিকে জাহাজগুলো তাঁদের অবস্থানের কাছাকাছি চলে আসে।

তাঁরা নদীর যে পাড়ে অবস্থান নিয়েছিলেন, তার পাশ দিয়েই ওই জাহাজগুলো যাচ্ছিল। হাবিব সহযোদ্ধাদের বলে দিলেন তাঁর সংকেতের আগে কেউ যেন গুলি না করেন। তাই সবাই অ্যামবুশস্থলে চুপ করে ছিলেন। এর মধ্যে দুটি জাহাজ চলে যায়। সবাই অস্ত্রের ট্রিগারে আঙুল রেখে অপেক্ষা করছেন। এমন সময় সবচেয়ে বড় দুটি জাহাজ তাঁদের সামনে আসে। তখন জাহাজে পাকিস্তানি সেনারা গল্পগুজবে মশগুল। হাবিবের এলএমজি গর্জে ওঠামাত্র সহযোদ্ধারা মর্টার, এলএমজি ও রাইফেল থেকে গুলিবর্ষণ শুরু করেন। ২ ইঞ্চি মর্টারের গোলা আঘাত করে সারেঙের কেবিন ও পাকিস্তানি সেনাদের অবস্থানে। হতাহত হয় বেশ কজন পাকিস্তানি সেনা। বেঁচে যাওয়া অন্য পাকিস্তানি সেনারা প্রতিরোধের চেষ্টা না করে স্পিডবোটে করে পালিয়ে যায়। সামনের দুটি ও পেছনে থাকা বাকি জাহাজও সাহায্যে এগিয়ে না এসে পালাতে থাকে।

হাবিবের নির্দেশে মুক্তিযোদ্ধারা জাহাজ দুটি থেকে সঙ্গে সঙ্গে অস্ত্রশস্ত্র নামিয়ে নিতে থাকেন। ছয় ঘণ্টায় তাঁরা প্রায় ৫০০ অস্ত্র ও গোলাবারুদের বাক্স নামাতে সক্ষম হন। এর পরও বিপুল অস্ত্র জাহাজে থেকে যায়। সেগুলো তাঁরা নেননি। কারণ, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পাল্টা আক্রমণের আশঙ্কা ছিল। জাহাজে আগুন ধরিয়ে দিয়ে তাঁরা চলে আসেন। আগুনে গোলাবারুদ বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হয়ে দুটি জাহাজই ধ্বংস হয়। এর পর থেকে হাবিবুর রহমানের নাম হয়ে যায় জাহাজমারা হাবিব।

হাবিবুর রহমান পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে কর্মরত ছিলেন। ১৯৭১ সালের মার্চে ছুটিতে থাকা অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে যোগ দেন প্রতিরোধযুদ্ধে। পরে কাদেরিয়া বাহিনীতে যোগ দেন। টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর এলাকায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন তিনি।

সূত্র: একাত্তরের বীরযোদ্ধা: খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, প্রথম খণ্ড, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা ২০১২

সম্পাদক: মতিউর রহমান, সংগ্রহ ও গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান