বীরত্বসূচক খেতাবপ্রাপ্তদের তালিকা

মো. নজরুল ইসলাম, বীর প্রতীক

  • গ্রাম চরবাতিয়া, শাহজাদপুর, পাবনা।

  • বাবা কেরামত আলী, মা লুত্ফন নেছা।

  • স্ত্রী রওনক জাহান। তাঁদের এক ছেলে ও দুই মেয়ে।

  • খেতাবের সনদ নম্বর ২৭২।

মো. নজরুল ইসলাম

পাবনার পাকশী ও কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা রেলস্টেশনের মাঝ বরাবর পদ্মা নদীর ওপর হার্ডিঞ্জ ব্রিজ। ১ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এ রেলসেতুর পুরোটাই ইস্পাতের তৈরি। দেশের পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই রেলসেতু ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মুক্তিযুদ্ধের সময় হার্ডিঞ্জ ব্রিজ রক্ষার জন্য পাকিস্তানি সেনাবাহিনী রাতে নদীর দুই পাড়ে শক্তিশালী সার্চলাইট জ্বালিয়ে রাখত। নদীতে কচুরিপানা ভেসে গেলেও দেখা যেত। কয়েকটি গানবোট সর্বক্ষণ টহল দিয়ে বেড়াত। সেতুর দুই পাশে ছিল পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্প। প্রথমবার মুক্তিবাহিনীর নৌ-কমান্ডোরা সেতুতে অপারেশন করতে ব্যর্থ হন। ফিরে যাওয়ার পথে তাঁরা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। পরে নৌ-কমান্ডো আহসানউল্লাহর (বীর প্রতীক) নেতৃত্বে আরেকটি দলকে এ জন্য ভারত থেকে পাঠানো হয়। এ দলে ছিলেন মো. নজরুল ইসলাম। তাঁরাও প্রথমবার ব্যর্থ হন। এরপর তাঁরা দুর্যোগপূর্ণ একটি দিনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন। কয়েক দিন পরই শুরু হয় ঝড়-বৃষ্টি। ওই দিন সমুদ্র এলাকায় ছিল ৯ নম্বর বিপত্সংকেত। ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসের শেষ দিকের একটি দিন।

নৌ-কমান্ডো নজরুল ইসলামসহ তাঁর দলনেতা অপারেশনের জন্য বেছে নিলেন এ দিনটিই। গোপন ঘাঁটিতে বিকেল থেকে শুরু হলো প্রস্তুতি। সন্ধ্যায় খেয়ে বিশ্রাম নিয়ে রওনা হলেন তাঁরা। কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌঁছে গেলেন নদীর ধারে। তারপর নেমে পড়লেন নদীতে। তখন মধ্যরাত। টার্গেটের (রেলসেতু) আশপাশে কড়া পাহারা। চারদিক আলোকিত। নদীর দুই পাড়ে শক্তিশালী সার্চলাইট জ্বালানো। অন্যদিকে নদীতে প্রবল স্রোত। সবকিছু উপেক্ষা করে নজরুল ইসলাম ও তাঁর সহযোদ্ধারা এগিয়ে যেতে থাকলেন রেলসেতুর নির্দিষ্ট পিলার লক্ষ্য করে। অনেক কষ্টে পৌঁছালেন সেখানে। তারপর পিলার বেয়ে ওপরে উঠলেন। সেতুর দুই পাশে লোহার ফেন্সিং। তাতে ডেটোনেটর লাগানোর কাজ শেষ হলো মিনিট কয়েকের মধ্যে। তারপর সেফটি ফিউজ অন করে ঝাঁপ দিলেন নদীতে। স্রোতের অনুকূলে ডুব দিয়ে চলে গেলেন নিরাপদ জায়গায়। ১৫-২০ মিনিট পরই ঘটল বিস্ফোরণ। সেতুর ওপর ভেঙে পড়ল লোহার বিরাট রেলিং।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও পাকিস্তানি সেনাদের কঠোর প্রহরার মধ্যেই দুঃসাহসিকতার সঙ্গে নজরুল ইসলাম ও তাঁর সহযোদ্ধারা এই অপারেশন পরিচালনা করেন। সেতুর মূল কাঠামো ধ্বংস করা তাঁদের লক্ষ্য ছিল না। রেল যোগাযোগ ব্যাহত করাই ছিল তাঁদের লক্ষ্য। সেদিন তাঁরা সফলতার সঙ্গে তা করতে সক্ষম হন।

মো. নজরুল ইসলাম পাকিস্তানি নৌবাহিনীতে চাকরি করতেন। কর্মরত ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানে। ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ছুটি নিয়ে দেশে আসেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে যুদ্ধে যোগ দেন। প্রতিরোধযুদ্ধের সময় পাবনা জেলার কাশীনাথপুরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে রক্তক্ষয়ী এক যুদ্ধ হয়। ওই যুদ্ধে তিনি অংশ নেন। এরপর ভারতে চলে যান। পরে মুক্তিবাহিনীর নৌ-কমান্ডো দলে তাঁকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ‘অপারেশন জ্যাকপট’-এর অধীনে মংলা বন্দরে অপারেশন পরিচালনার পাশাপাশি আরও কয়েকটি অপারেশনে তিনি অংশ নেন।

সূত্র: একাত্তরের বীরযোদ্ধা: খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, প্রথম খণ্ড, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা ২০১২

সম্পাদক: মতিউর রহমান, সংগ্রহ ও গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান