বীরত্বসূচক খেতাবপ্রাপ্তদের তালিকা
মো. গিয়াস উদ্দিন সমসের, বীর প্রতীক
গ্রাম আড়াইসিধা, উপজেলা আশুগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
বাবা সোনা মিয়া মুন্সি, মা আছিয়া খাতুন সিকদার। স্ত্রী সামছুন্নাহার রেনু। তাঁদের এক ছেলে।
খেতাবের সনদ নম্বর ১৬৬। গেজেটে নাম বাচ্চু মিয়া।
শহীদ ১৩ এপ্রিল ১৯৭১।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার অন্তর্গত আশুগঞ্জ। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত আশুগঞ্জ মুক্ত ছিল। এ সময় বাচ্চু মিয়াসহ একদল মুক্তিযোদ্ধা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীকে প্রতিরোধের জন্য আশুগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে প্রতিরক্ষা অবস্থান নেন। তাঁরা ছিলেন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর, মুজাহিদ, আনসার, পুলিশ ও ছাত্র-যুবক সমন্বয়ে গড়া। তাঁদের সার্বিক নেতৃত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন আইন উদ্দিন (বীর প্রতীক, পরে মেজর জেনারেল)।
পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আশুগঞ্জ দখলের জন্য ১৩ এপ্রিল ব্যাপক অভিযান শুরু করে। সড়কপথে বিপুলসংখ্যক সেনা ভৈরবে উপস্থিত হয়। আশুগঞ্জ বিদ্যুত্ উত্পাদন কেন্দ্রের পেছনের মাঠে হেলিকপ্টারে কমান্ডো ব্যাটালিয়নের প্রায় এক কোম্পানি সেনা নামে। গানবোট ও অ্যাসল্ট ক্রাফটের সাহায্যে নদীপথে সেনা আসে। এ ছাড়া জঙ্গি বিমান ও আর্টিলারির কাভারিং ফায়ারের মাধ্যমে ভৈরব-আশুগঞ্জ রেলসেতুর ওপর দিয়েও সেনারা অগ্রসর হয়।
আশুগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন প্রায় ২০০ জন। অর্ধেকই স্বল্প প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণ তাঁরা বিক্রমের সঙ্গে মোকাবিলা করেন। কিন্তু জল-স্থল-আকাশপথের ত্রিমুখী সাঁড়াশি আক্রমণে তাঁরা সেখানে টিকতে পারেননি। বীরত্ব ও সাহসের সঙ্গে যুদ্ধ করেও তাঁরা ব্যর্থ হন। একপর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতি স্বীকার করে তাঁদের পিছু হটতে হয়।
মো. গিয়াস উদ্দিন সমসের (বাচ্চু মিয়া) সোনারামপুর ওয়াপদা বাঁধসংলগ্ন এক পরিখায় (ট্রেঞ্চ) ছিলেন। সেখানে তিনিসহ মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন ১১ জন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণ তাঁরা সাহসের সঙ্গে মোকাবিলা করেন। অনেকক্ষণ তাঁরা পাকিস্তানি সেনাদের ঠেকিয়ে রাখেন। একপর্যায়ে পাকিস্তানিদের প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে তাঁরাও জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে পড়েন। তখন তাঁর বেশির ভাগ সহযোদ্ধা জীবন বাঁচাতে পিছু হটেন। কিন্তু মো. গিয়াস উদ্দিন সমসের ও তাঁর দুই সহযোদ্ধা পিছু হটেননি। তাঁরা নিজ নিজ পরিখার মধ্যে থেকে সম্মুখযুদ্ধ করেন।
এ সময় তাঁরা তিনজনই গুলিতে আহত হন। আহত অবস্থায় মো. গিয়াস উদ্দিন সমসের ‘শেষ ব্যক্তি, শেষ গুলি’ পর্যন্ত আরও কিছুক্ষণ লড়াই করেন। কিন্তু তাঁর অস্ত্রের গুলি শেষ হয়ে যায়। তখন পাকিস্তানি সেনারা তাঁকে ও তাঁর দুই সহযোদ্ধাকে আটক এবং বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। তাঁদের মরদেহ সহযোদ্ধারা উদ্ধার করতে পারেননি।
মো. গিয়াস উদ্দিন সমসের মুজাহিদ বাহিনীর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিলেন। অনিয়মিত হিসেবে দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন। অনিয়মিত মুজাহিদ সদস্যরা ভিন্ন কাজে যুক্ত থাকতে পারতেন। ১৯৭১ সালে তিনি ছোটখাটো ব্যবসা করতেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি প্রতিরোধযুদ্ধরত চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে যোগ দেন।
সূত্র: একাত্তরের বীরযোদ্ধা: খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, দ্বিতীয় খণ্ড, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা ২০১৩
সম্পাদক: মতিউর রহমান, সংগ্রহ ও গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান
Also Read
-
ওয়াসার মিটার বাক্স: চামচে তুলে আনা পানিতে কিলবিল করছিল মশার লার্ভা
-
মিয়ানমারে মানবতাবিরোধী অপরাধে সহায়তার অভিযোগে তদন্তের মুখে টেলিনর
-
২৮ বছর পর বাবার ঋণ শোধ করতে পাওনাদারের খোঁজে সন্তান
-
এবার যাত্রাবাড়ী থানার সামনে ককটেল বিস্ফোরণ, অটোচালক আহত
-
ইসলামপন্থী রাজনীতি করতে হলে গণসার্বভৌমত্বকে স্বীকার করতে হবে: আলী রীয়াজ