বীরত্বসূচক খেতাবপ্রাপ্তদের তালিকা

নজরুল ইসলাম, বীর প্রতীক

  • গ্রাম বাংগরা, উপজেলা নবীনগর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া। বর্তমান ঠিকানা গন্ধমতী, কোটবাড়ী, সদর, কুমিল্লা।

  • বাবা মুন্সি ওয়ালী মিয়া, মা রোকেয়া বেগম।

  • স্ত্রী রেণু আরা বেগম। তাঁদের দুই ছেলে ও দুই মেয়ে।

  • খেতাবের সনদ নম্বর ২১৮।

নজরুল ইসলাম

মুহুর্মুহু গুলির শব্দে চারদিকের নিস্তব্ধতা খান খান হয়ে গেল। প্রচণ্ড গোলাগুলিতে গোটা এলাকা প্রকম্পিত। নজরুল ইসলাম ও তাঁর সহযোদ্ধারা অতর্কিতে আক্রমণ চালিয়েছেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অবস্থানে। পাকিস্তানি সেনা ও তাদের সহযোগীরা বসে থাকল না। তারাও পাল্টা আক্রমণ শুরু করল। প্রচণ্ড যুদ্ধের একপর্যায়ে পাকিস্তানি সেনা ও তাদের সহযোগীরা অবস্থান ছেড়ে পিছু হটতে থাকল। এ ঘটনা ভুরুঙ্গামারীর। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের মাঝামাঝি বা শেষ দিকে।

ভুরুঙ্গামারী কুড়িগ্রাম জেলার অন্তর্গত। জেলা সদরের সর্ব উত্তরে। ভারতের আসাম রাজ্যের সীমানায়। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ভুরুঙ্গামারীর বিভিন্ন স্থানে প্রতিরক্ষা অবস্থান গড়ে তোলে। থানায় ছিল একটি অবস্থান। পুলিশের পাশাপাশি সেখানে ছিল কিছু পাকিস্তানি সেনা। এ ছাড়া সহযোগী হিসেবে ছিল একদল ইপিসিএএফ ও রাজাকার।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, মুক্তিযোদ্ধারা তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে এই আক্রমণে অংশ নেন। দুটি দল আক্রমণকারী ও একটি কাট অফ পার্টি হিসেবে। তাঁরা ছিলেন ৪০ জন। নজরুল ইসলাম ছিলেন আক্রমণকারী দলে।

নজরুল ইসলামসহ কয়েকজন সাহসের সঙ্গে গুলি করতে করতে থানার মধ্যে ঢুকে পড়েন। পাকিস্তানি সেনা ও তাদের সহযোগীরা গ্রেনেড ও গুলি ছুড়ে নজরুল ইসলামদের প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে। কিন্তু তাঁরা অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যান। তাঁদের সাহস ও বীরত্বে পাকিস্তানি সেনা ও তাদের সহযোগীরা দিশাহারা হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে তারা অবস্থান ছেড়ে পিছু হটতে শুরু করে।

মুক্তিযোদ্ধারা সাময়িকের জন্য থানা দখল করেন। তাঁদের হস্তগত হয় বিপুলসংখ্যক অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ। একটি বাংকার থেকে তাঁরা উদ্ধার করেন ১১ জন নির্যাতিত নারীকে।

সেদিন যুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগীদের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে একজন আহত হন। মুক্তিযোদ্ধারা থানা দখল করতে সক্ষম হলেও তা ধরে রাখার ক্ষমতা তাঁদের ছিল না। কারণ, আশপাশেই ছিল পাকিস্তানি সেনাদের অবস্থান। পুনরায় সংগঠিত হয়ে তারা আক্রমণ চালাবে। সে জন্য মুক্তিযোদ্ধারা সকাল হওয়ার আগেই নদী অতিক্রম করে ভারতে চলে যান।

নজরুল ইসলাম চাকরি করতেন ইপিআরে। ১৯৭১ সালে কর্মরত ছিলেন লালমনিরহাট জেলার মোগলহাট বিওপিতে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তাতে যোগ দেন। প্রতিরোধযুদ্ধ শেষে ভারতে যান। পরে যুদ্ধ করেন ৬ নম্বর সেক্টরের সাহেবগঞ্জ সাবসেক্টরে। ফুলবাড়ী, অনন্তপুর, গঙ্গারহাট, শিমুলবাড়িসহ আরও কয়েক স্থানে সাহসের সঙ্গে যুদ্ধ করেন তিনি।

সূত্র: একাত্তরের বীরযোদ্ধা: খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, দ্বিতীয় খণ্ড, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা ২০১৩

সম্পাদক: মতিউর রহমান, সংগ্রহ ও গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান