বীরত্বসূচক খেতাবপ্রাপ্তদের তালিকা

জালাল আহম্মেদ, বীর প্রতীক

  • গ্রাম কুহুমা, ইউনিয়ন রাধানগর, ছাগলনাইয়া, ফেনী।

  • বাবা শেখ আহম্মদ, মা রহিমের নেছা।

  • স্ত্রী গুলনাহার বানু। তাঁদের তিন মেয়ে ও এক ছেলে।

  • খেতাবের সনদ নম্বর ৫৩।

জালাল আহম্মেদ

মধ্যরাতে হঠাৎ হইচই আর প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দে ঘুম ভেঙে গেল জালাল আহম্মেদের। তাঁদের ব্যারাকের ওপর তীব্র গুলিবর্ষণ চলছে। উঠে দেখতে পেলেন, ঘুমন্ত অবস্থাতেই গুলিবিদ্ধ হয়ে অনেকে শহীদ হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও অনেকে। চারদিকে শুধু রক্ত আর লাশ। যাঁরা আহত, তাঁরা আর্তনাদ করছেন। যাঁরা গুলিবিদ্ধ হননি, তাঁরা দিশেহারা হয়ে ছোটাছুটি করছেন। বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে তিনিও একজন। জানতে পারলেন, পাকিস্তানি সেনারা (২০ বালুচ রেজিমেন্ট) তাঁদের ওপর আক্রমণ করেছে।

এ ঘটনা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতের। ঘটেছিল চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে (ইবিআরসি)। তখন সেখানে প্রশিক্ষণরত প্রায় দুই হাজার সেনাসদস্য ছিলেন। সবাই বাঙালি। সুবেদার জালাল আহম্মেদ ছিলেন তাঁদের একজন প্রশিক্ষক। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী প্রশিক্ষণরত প্রায় দেড় হাজার বাঙালি সেনাকে ঘুমন্ত অবস্থায় নির্মমভাবে হত্যা করে। বাকি সেনারা পালিয়ে পার্শ্ববর্তী পাহাড়ে আশ্রয় নিয়ে প্রাণে রক্ষা পান। তাঁদের মধ্যে জালাল আহম্মেদও ছিলেন।

পরে তিনি স্থানীয় প্রতিরোধযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দেন। তাঁদের সঙ্গে চট্টগ্রামের বারো আউলিয়ায় পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। কিন্তু পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আক্রমণে তাঁরা একপর্যায়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েন। তখন তিনি নিজ এলাকা হয়ে ভারতে চলে যান। সেখানে প্রথমে কিছুদিন প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। পরে তাঁকে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

জালাল আহম্মেদ যুদ্ধে প্রথম অংশ নেন শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলার নকশী বিওপিতে। ৪ আগস্ট অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে আক্রমণ করলে সেখানে ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। তিনি ছিলেন আলফা কোম্পানির একটি প্লাটুনের নেতৃত্বে। নকশীতে তাঁরা যখন পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পের ১০০ গজের মধ্যে পৌঁছে যান, ঠিক তখনই পাকিস্তানি সেনাদের একটি গোলা তাঁদের অবস্থানের ওপর বিস্ফোরিত হয়। এতে শহীদ হন বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা। ঘটনার এই আকস্মিকতার মুখে তাঁদের আপাতত ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়তে হয়। এর পরও তাঁদের অনেকে আরও এগিয়ে যান এবং পলায়নরত পাকিস্তানি সেনাদের ওপর আক্রমণ চালাতে থাকেন। ফলে পাকিস্তানি সেনারাও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়। অবশ্য নকশীতে মুক্তিযোদ্ধারা সফল হতে পারেননি। এরপর তাঁদের কিছুদিন বিশ্রামে রাখা হয়। জালাল আহম্মেদ পরবর্তী সময়ে যুদ্ধ করেন বৃহত্তর সিলেট জেলায়। বড়লেখা ও ভানুগাছে যুদ্ধ করার পর তাঁদের দল ফেঞ্চুগঞ্জ হয়ে সুরমা নদীর দক্ষিণ তীরের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। তখন মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়। সেখানে সংঘটিত যুদ্ধে জালাল আহম্মেদসহ আরও কয়েকজন আহত হন।

সূত্র: একাত্তরের বীরযোদ্ধা: খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, প্রথম খণ্ড, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা ২০১২

সম্পাদক: মতিউর রহমান, সংগ্রহ ও গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান