বীরত্বসূচক খেতাবপ্রাপ্তদের তালিকা
গাজী রহমতউল্লাহ, বীর প্রতীক
গ্রাম গড়ইখালী, পাইকগাছা, খুলনা।
বাবা শহর আলী গাজী, মা অভিরন নেছা।
স্ত্রী সাহানা। তাঁদের তিন ছেলে ও এক মেয়ে।
খেতাবের সনদ নম্বর ২৭৩।
মংলা বন্দরের উত্তরে বাজুয়ার পার্শ্ববর্তী শিবসা নদী। ১৯৭১ সালের নভেম্বরের মাঝামাঝি। নদীতে পাশাপাশি নোঙর করা পাঁচ-ছয়টি জাহাজ। সেগুলো খাদ্যভর্তি। দুটি জাহাজ থেকে মালামাল খালাস করার কাজ চলছে। জাহাজগুলোর নিরাপত্তার জন্য সেখানে আছে বেশ কিছু পাকিস্তানি সেনা। রাতে নোঙর করা জাহাজের আলোয় জায়গাটি মনে হয় ছোটখাটো উজ্জ্বল শহর। জাহাজগুলো ধ্বংস করার জন্য অদূরে সুন্দরবনের পাশে সুতারখালীতে অবস্থান নিয়েছেন মুক্তিবাহিনীর একদল নৌ-কমান্ডো। তাঁদের নেতৃত্বে গাজী রহমতউল্লাহ ও বদিউল আলম। দুজনই এর আগে আলাদাভাবে বেশ কটি অপারেশনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু এবারের অপারেশন বেশ কঠিন। রেকি পার্টি অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে জানিয়েছে, জাহাজের চারদিকে গড়ে তোলা হয়েছে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা। এর মধ্যে অপারেশন করা সম্ভব নয়। কিন্তু গাজী রহমতউল্লাহ নাছোড়বান্দা, এর মধ্যেই তিনি অপারেশন চালাবেন।
২৪ নভেম্বর সন্ধ্যার পর গাজী রহমতউল্লাহ নৌ-কমান্ডোদের নিয়ে রওনা হলেন লক্ষ্যস্থলের দিকে। সেদিন আবহাওয়া মেঘলা। হালকা বৃষ্টি হচ্ছে। নদীতে টহল দিচ্ছে পাকিস্তানি গানবোট। এ জন্য গাজী রহমতউল্লাহ ও তাঁর সহযোদ্ধারা বেশ সতর্ক, যেন তাঁদের অপারেশন ব্যর্থ না হয়। প্রতিটি জাহাজের জন্য চারজনের একটি দল। প্রবল বাতাসে পানির বিশাল ঢেউ মাড়িয়ে জাহাজের কাছে পৌঁছাতে তাঁদের অনেক সময় লেগে গেল। আগের অপারেশনে এত সময় লাগেনি। শেষ পর্যন্ত সব দলই দক্ষতার সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে জাহাজে মাইন লাগাতে সক্ষম হলেন। আধঘণ্টা পর সবচেয়ে বড় জাহাজে প্রথম বিস্ফোরণ ঘটল। সেই বিস্ফোরণের ঢেউ অন্য সব জাহাজেও ছড়িয়ে পড়ল। কিছুক্ষণের মধ্যে অন্য জাহাজগুলোয় লাগানো মাইনও একে একে বিস্ফোরিত হলো এবং ভয়াবহ অগ্নিকুণ্ডের সৃষ্টি হলো। জ্বলন্ত জাহাজগুলো ক্রমেই পানিতে তলিয়ে যেতে শুরু করল। আকস্মিকভাবে এ সময়ই শুরু হলো পাকিস্তানি গানবোট থেকে অবিরাম বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ। বন্দরে স্থাপিত পাকিস্তানি কামানগুলোও গর্জে উঠল। ট্রেসিং বোমার আলোয় চারদিক তখন দিনের মতো আলোকিত। সন্ধানী বোমার আলো-আঁধারির মধ্যে নৌ-কমান্ডোরা গাজী রহমতউল্লাহর নেতৃত্বে এগিয়ে যেতে থাকলেন নিরাপদ স্থানের দিকে। ভোর হওয়ার আগেই পৌঁছে গেলেন সুতারখালীতে। এই অপারেশনের মধ্য দিয়ে চুরমার হয়ে গেল পাকিস্তানি সেনাদের গর্ব। ২৮ নভেম্বর রাতে বিবিসি ও ভয়েস অব আমেরিকায় এই অপারেশনের খবর বেশ গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করা হয়।
গাজী রহমতউল্লাহ পাকিস্তানি নৌবাহিনীতে চাকরি করতেন। ১৯৭১ সালে প্রশিক্ষণরত ছিলেন ফ্রান্সের তুলোঁ নৌ-ঘাঁটিতে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনিসহ নয়জন বাঙালি সহযোদ্ধা পালিয়ে ভারতে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। মূলত গাজী রহমতউল্লাহর পরিকল্পনাতেই নৌ-কমান্ডো বাহিনী গঠিত হয়। তিনি প্রথম অপারেশন চালান চট্টগ্রাম বন্দরে। স্থলযুদ্ধেও তিনি অংশ নেন। ২৫ নভেম্বর ২০০ জন মুক্তিযোদ্ধা ও নৌ-কমান্ডো যৌথভাবে খুলনার পাইকগাছা থানার কপিলমুনি রাজাকার ঘাঁটিতে আক্রমণ করেন। এ যুদ্ধে তিনি, কামরুজ্জামান টুকু, খিজির আলী ও সামসুল আরেফিন যৌথভাবে নেতৃত্ব দেন। চার দিন যুদ্ধের পর রাজাকার ঘাঁটির পতন ঘটে এবং ১০৭ জন রাজাকার আত্মসমর্পণ করে।
সূত্র: একাত্তরের বীরযোদ্ধা: খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, প্রথম খণ্ড, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা ২০১২
সম্পাদক: মতিউর রহমান, সংগ্রহ ও গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান
Also Read
-
যুক্তরাষ্ট্রে নিখোঁজ দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর একজনের মরদেহ উদ্ধার
-
ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনা নেই ইরানের
-
ন্যাটো থেকে স্পেনকে বাদ দেওয়ার কথা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র
-
মোজতবা খামেনির শরীরে একাধিক অস্ত্রোপচার, লাগতে পারে কৃত্রিম অঙ্গ
-
মুক্ত গণমাধ্যমকে পোড়ালে গণতন্ত্রও পুড়ে যায়