বীরত্বসূচক খেতাবপ্রাপ্তদের তালিকা
এরশাদ আলী, বীর উত্তম
গ্রাম বৈষ্ণবপুর, সেনবাগ, নোয়াখালী।
বাবা আলী মিয়া, মা আসমতের নেছা। স্ত্রী নুরুন নেছা। তাঁদের এক মেয়ে।
খেতাবের সনদ নম্বর ৪৯।
শহীদ ২ এপ্রিল ১৯৭১।
২৫ মার্চের পর রংপুর ইপিআর উইংয়ের বাঙালি সদস্যরা অবস্থান নেন কাউনিয়ায়। ৩১ মার্চ রংপুর সেনানিবাস থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ২৬ ফ্রন্টিয়ার ফোর্স কাউনিয়ার দিকে অগ্রসর হয়। তখন ইপিআর সেনারা কৌশলগত কারণে পিছু হটে তিস্তা রেলসেতুর কুড়িগ্রাম প্রান্তে অবস্থান নেন। মুক্তিযোদ্ধাদের দলে ছিলেন এরশাদ আলী। এখানে তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন লালমনিরহাট, কালীগঞ্জ, হাতীবান্ধা, পাটগ্রাম ও কুড়িগ্রাম থেকে আসা ইপিআর সদস্য, পুলিশ, আনসার ও ছাত্র-জনতা। তাঁরা রেলসেতুর মাঝের স্লিপার খুলে কুড়িগ্রাম প্রান্তে লাইনের ওপর গাছের গুঁড়ি ফেলে রাখেন।
১ এপ্রিল কাউনিয়া রেলস্টেশন থেকে একদল পাকিস্তানি সেনা ট্রেনে তিস্তা সেতু অভিমুখে যাত্রা করে। মুক্তিযোদ্ধারা সেতুর কুড়িগ্রাম প্রান্তে প্রতিরক্ষা অবস্থান নিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের অপেক্ষায় ছিলেন। ট্রেন মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রের আওতায় আসামাত্র তাঁরা একযোগে আক্রমণ চালান। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীও পাল্টা আক্রমণ চালায়। এ যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মেজর এজাজ মোস্তফা, ১৫ জন সেনা ও কাউনিয়া থানার ওসি নিহত হন। বাকি পাকিস্তানি সেনারা পালিয়ে যায়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে এ ছিল বিরাট সাফল্য। এ সাফল্যে মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে উত্সাহ-উদ্দীপনা বহু গুণ বেড়ে যায়।
যুদ্ধের সাফল্যে এরশাদ আলী ও তাঁর সহযোদ্ধারা তখন বেশ উদ্দীপ্ত। তবে আনন্দের আতিশয্যে তাঁরা ভাসছেন না। এ রকম আনন্দের মধ্যেও সবাই তিস্তা রেলসেতুর প্রতিরক্ষা অবস্থানের নিজ নিজ বাংকারে সজাগ-সতর্ক। কারণ, যেকোনো সময় পাকিস্তানি সেনারা তাঁদের ওপর আবারও আক্রমণ করতে পারে। রাতে তাঁরা পালা করে ঘুমালেন।
২ এপ্রিল। সকাল হতেই সত্যি সত্যি এরশাদ আলী ও তাঁর সহযোদ্ধাদের অবস্থানের ওপর শুরু হলো পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আর্টিলারি গোলাবর্ষণ। পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নতুন দল ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে রংপুর সেনানিবাস থেকে পরদিন এখানে এসে আবার আক্রমণ চালায়। বিপুলসংখ্যক পাকিস্তানি সেনা ব্যাপক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে এই আক্রমণ পরিচালনায় অংশ নেয়। আক্রমণের প্রচণ্ডতায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়লেন মুক্তিযোদ্ধারা। তাঁরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলেন। কিন্তু এরশাদ আলী গেলেন না। বিপুল বিক্রমে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে লড়াই করতে থাকলেন। তাঁর বীরত্বে উদ্দীপ্ত হলেন আরও কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা। তাঁরা নিজ নিজ বাংকার থেকে যুদ্ধ করতে থাকেন। যুদ্ধের একপর্যায়ে এরশাদ আলীর সহযোদ্ধা আতাহার আলী মল্লিক (বীর বিক্রম) শহীদ হন। কিছুক্ষণ পর এক ঝাঁক গুলি এসে লাগে এরশাদ আলীর বুকে। ভেঙে পড়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ। বাকি মুক্তিযোদ্ধারা পিছিয়ে যেতে বাধ্য হলেন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান দখল করে নেয়। রক্তে রঞ্জিত বাংকারে পড়ে থাকল এরশাদ আলীর নিথর দেহ।
সহযোদ্ধারা এই অপারেশনে শহীদ দুই মুক্তিযোদ্ধার মরদেহ উদ্ধার করতে পারেননি।
এরশাদ আলী চাকরি করতেন ইপিআরে। ১৯৭১ সালে কর্মরত ছিলেন দিনাজপুর ইপিআর সেক্টরের রংপুর উইংয়ে।
সূত্র: একাত্তরের বীরযোদ্ধা: খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, প্রথম খণ্ড, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা ২০১২
সম্পাদক: মতিউর রহমান, সংগ্রহ ও গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান
Also Read
-
জনপ্রশাসনে বড় পরিবর্তন
-
বিদায়ের দিনে তাজুলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এক প্রসিকিউটরের, তাজুল বললেন ‘মিথ্যা’
-
পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি
-
খামেনির সিদ্ধান্ত: যুদ্ধ বা গুপ্তহত্যার শিকার হলে ইরানের নেতৃত্ব দেবেন জাতীয় নিরাপত্তাপ্রধান
-
ফুটেজে চেহারা স্পষ্ট নয়—অন্য কোনো ‘ক্লু’ও নেই, হাঁটার ভঙ্গি দেখে খুনের রহস্য উদ্ঘাটন