বীরত্বসূচক খেতাবপ্রাপ্তদের তালিকা
আবদুল মান্নান, বীর উত্তম
গ্রাম পশ্চিম ডেকরা, চৌদ্দগ্রাম, কুমিল্লা।
বাবা আবদুল জব্বার খন্দকার, মা আসকিরের নেছা। অবিবাহিত।
খেতাবের সনদ নম্বর ৩৭।
শহীদ ২৪ সেপ্টেম্বর ১৯৭১।
মুক্তিযোদ্ধাদের সফল ফাঁদে (অ্যামবুশ) পড়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে অসংখ্য পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়। যারা বেচে গেছে, তাদের বেশির ভাগ আহত। যাদের গায়ে গুলি লাগেনি, তারা পাগলের মতো ছোটাছুটি করছে। ফাঁদের বাইরে থাকা পাকিস্তানি সেনারা অবস্থান নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করছিল। প্রচণ্ড গোলাগুলিতে গোটা এলাকা তখন প্রকম্পিত। মুক্তিযোদ্ধারা বেশ নিরাপদ অবস্থানে থেকে চালিয়ে যাচ্ছেন গুলি। পাকিস্তানি সেনাদের ছোড়া গুলি তাঁদের ধারেকাছে আসছে না। মুক্তিযোদ্ধাদের এই দলে ছিলেন আবদুল মান্নান, সাহসী ও অকুতোভয় এক যোদ্ধা। তাঁর গুলিতেই নিহত হয় বেশ কজন পাকিস্তানি সেনা। নিজের এই সাফল্যে তখন তিনি আনন্দে আত্মহারা, এ সময় তাঁর অবস্থানের সামনে দিয়ে পালাচ্ছিল এক পাকিস্তানি সেনা। তাকে দেখে আনন্দে আবদুল মান্নান সহযোদ্ধাদের বললেন, একে জীবিত ধরতে হবে এবং তিনি নিজেই তাকে ধরবেন। এ কথা বলে পরিখা থেকে লাফ দিয়ে উঠে গোলাগুলির মধ্যেই ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে তিনি এগিয়ে গেলেন ওই পাকিস্তানি সেনার দিকে। কিন্তু তাঁর দুর্ভাগ্য! পাকিস্তানি সেনাকে জীবিত ধরতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে সাহসী যোদ্ধা আবদুল মান্নান শহীদ হন। এ ঘটনা ১৯৭১ সালের ২৪ সেপ্টেম্বরের। ঘটেছিল হবিগঞ্জ জেলার কালেঙ্গায়।
মুক্তিযোদ্ধারা সেদিন সিন্দুরখান-কালেঙ্গা রাস্তার পার্শ্ববর্তী ছোট ছোট টিলার ওপর অবস্থান নিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণ করার জন্য ফাঁদ পাতেন। তাঁরা আগেই খবর পেয়েছিলেন, পাকিস্তানি সেনাদের একটি দল কালেঙ্গায় টহল দিতে আসবে। দুই দিন আগে পাকিস্তানি সেনারা কালেঙ্গায় ঘাঁটি স্থাপনের জন্য এসেছিল। তখন তারা কোনো বাধার সম্মুখীন হয়নি। ফলে পাকিস্তানি সেনারা বেপরোয়াভাবেই এগিয়ে আসছিল। তাদের পুরোভাগে ছিল একদল রাজাকার। রাজাকাররা যখন মুক্তিযোদ্ধাদের অ্যামবুশ করা এলাকার মধ্যে চলে আসে, তখন তাঁরা চুপ করে থাকেন। তাঁরা অপেক্ষায় থাকেন শুধু পাকিস্তানি সেনাদের জন্য। তারা যখন মুক্তিযোদ্ধাদের ফাঁদের ভেতরে ঢুকে পড়ে, তখন একযোগে গর্জে ওঠে তাঁদের প্রত্যেকের অস্ত্র। চারদিক থেকে তাঁরা পাকিস্তানি সেনাদের ওপর গুলি শুরু করেন। পাকিস্তানি সেনারা বিস্তীর্ণ এলাকা দিয়ে এগিয়ে আসছিল। ফলে সব পাকিস্তানি সেনা তাঁদের ফাঁদে পড়েনি। যারা ফাঁদের ভেতরে ঢুকে পড়ে, তাদের বেশির ভাগই মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণে নিহত হয়। ফাঁদের বাইরে থাকা পাকিস্তানি সেনারা দ্রুত অবস্থান নিয়ে বিপদগ্রস্ত সঙ্গীদের বাঁচানোর জন্য পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। কিন্তু এই আক্রমণে মুক্তিযোদ্ধাদের তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি। শুধু আবদুল মান্নান ওই সেনাকে ধরতে গিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে শহীদ হন। কয়েকজন আহত হন। অন্যদিকে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর এক অফিসারসহ ৪০-৪৫ জন নিহত ও অনেকে আহত হয়।
আবদুল মান্নান পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন। কর্মরত ছিলেন দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে। তখন তাঁর পদবি ছিল নায়েক। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি তাঁর ইউনিটের সঙ্গে প্রতিরোধযুদ্ধে যোগ দেন। পরে ৩ নম্বর সেক্টরের আশ্রমবাড়ী/বাঘাইবাড়ী সাব-সেক্টর এলাকায় যুদ্ধ করেন।
সূত্র: একাত্তরের বীরযোদ্ধা: খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, প্রথম খণ্ড, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা ২০১২
সম্পাদক: মতিউর রহমান, সংগ্রহ ও গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান
Also Read
-
জনপ্রশাসনে বড় পরিবর্তন
-
বিদায়ের দিনে তাজুলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এক প্রসিকিউটরের, তাজুল বললেন ‘মিথ্যা’
-
পুলিশের পোশাক পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি
-
ফুটেজে চেহারা স্পষ্ট নয়—অন্য কোনো ‘ক্লু’ও নেই, হাঁটার ভঙ্গি দেখে খুনের রহস্য উদ্ঘাটন
-
‘একটি আদর্শকে আগুন দিয়ে ধ্বংস করা যায় না’