বীরত্বসূচক খেতাবপ্রাপ্তদের তালিকা
আবদুল জলিল, বীর প্রতীক
গ্রাম পাল্লা, ঝিকরগাছা, যশোর।
বাবা মোহর আলী মোড়ল, মা ইয়ার বানু।
স্ত্রী হালিমা বেগম। তাঁদের চার ছেলে ও তিন মেয়ে।
খেতাবের সনদ নম্বর ২৫৬।
যশোর জেলা সদরের পশ্চিমে ঝিকরগাছা উপজেলা। ১৯৭১ সালের অক্টোবরের শেষ দিক। সন্ধ্যা। চারদিকে হালকা কুয়াশা। খালি চোখে দূরের কিছুই দেখা যায় না। অতি সন্তর্পণে মুক্তিবাহিনীর একটি দল এগিয়ে যাচ্ছে। দলে গণবাহিনীর ১৫ জন ও ইপিআরের কয়েকজন। তাঁরা দোসহাতিনায় (স্থানীয় কেউ কেউ বলেন দশাতিনা) এসে অবস্থান নেন। সেখানে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি শক্ত প্রতিরক্ষা অবস্থান ছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের নেতৃত্বে ছিলেন লেফটেন্যান্ট অলিক কুমারগুপ্ত। সেকেন্ড ইন কমান্ড ছিলেন ইপিআরের আবদুল জলিল।
সন্ধ্যা সাতটার দিকে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রতিরক্ষা অবস্থান লক্ষ্য করে একযোগে গর্জে উঠল মুক্তিযোদ্ধাদের সব অস্ত্র। পাকিস্তানি বাহিনী প্রথম দিকে পাল্টা আক্রমণের তেমন সুযোগ পেল না। তাদের দিক থেকে কেবল শোনা গেল চিৎকার আর আর্তনাদ। বিপর্যস্ত হয়ে গেল শত্রুর প্রতিরক্ষা অবস্থান। অবশ্য নিজেদের সামলে নিয়ে খানিকক্ষণ পর তারা পাল্টা আক্রমণ শুরু করে।
এবার দুই পক্ষের মধ্যে শুরু হয় প্রচণ্ড যুদ্ধ। আবদুল জলিল ও অন্য মুক্তিযোদ্ধারা বীরত্বের সঙ্গে যুদ্ধ করতে থাকেন। এ যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর ১০ জন সেনা নিহত হয়। তাদের পাঁচটি চায়নিজ রাইফেল, কয়েকটি হেলমেট ও কিছু খাদ্যসামগ্রী মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে আসে। যুদ্ধে অবশ্য একজন মুক্তিযোদ্ধা আহত হন।
মুক্তিযোদ্ধা আবদুল জলিল ৮ নম্বর সেক্টরের বয়রা সাব-সেক্টরের অধীন ঝিকরগাছা ও শার্শা এলাকায় যুদ্ধ করেন। বেশির ভাগ সময় তিনি ঝিকরগাছায় অবস্থান করতেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ওই এলাকায় প্রতিনিয়ত যুদ্ধ হয়। মে মাসের দিকে পাকিস্তানি সেনারা ঝিকরগাছা উপজেলার আজমপুর, বোদখানা, দোসহাতিনা ও গঙ্গাধরপুর গ্রামে বিভিন্ন দিন আক্রমণ চালায়। আবদুল জলিল ইপিআর সেনাদের সঙ্গে নিয়ে তখন পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর পাল্টা আক্রমণ চালান। তাঁদের আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে পাকিস্তানি সেনারা পশ্চাদপসরণ করতে বাধ্য হয়। পাকিস্তানি সেনারা জানতে পারে, এসব আক্রমণের নেতৃত্ব দিয়েছেন ইপিআরের আবদুল জলিল। তখন তারা লোকজনের সামনে বলে, ‘জলিল জিন নাহি হ্যায়, রকেট হ্যায়।’ সেই থেকে আবদুল জলিল হয়ে যান ‘রকেট জলিল’।
আবদুল জলিল একবার ঝিকরগাছার সিংড়ি ইউনিয়নের মধুখালী গ্রামে রাস্তায় মাইন বিস্ফোরণ ঘটিয়ে শত্রুপক্ষের কয়েকজনকে হতাহত করেন। এক দিন বেনেয়ালী এলাকা থেকে এক বিদেশি নারী যাজককে পাকিস্তানি তিন সেনা ধরে নিয়ে যাচ্ছিল। খবর পেয়ে আবদুল জলিল সহযোদ্ধা হাজারী লাল তরফদারকে (তিনিও বীর প্রতীক খেতাব পেয়েছেন) সঙ্গে নিয়ে তাদের আক্রমণ করেন এবং নারী যাজককে উদ্ধার করেন। দুজন পাকিস্তানি সেনা তাঁদের হাতে নিহত হয়। একজনকে তাঁরা জীবিত আটক করেন।
আবদুল জলিল ১৯৭১ সালে ইপিআরের ৭ নম্বর উইংয়ের অধীনে জয়পুরহাটের পাঁচবিবি সীমান্ত বিওপিতে কর্মরত ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি সেখান থেকে পালিয়ে নিজ এলাকা যশোরের ঝিকরগাছায় চলে আসেন। পরে স্থানীয় প্রতিরোধযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দেন এবং বিভিন্ন স্থানে প্রাথমিক প্রতিরোধযুদ্ধে অংশ নেন। এরপর তিনি ভারতে চলে যান প্রশিক্ষণ নিতে।
সূত্র: একাত্তরের বীরযোদ্ধা: খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, প্রথম খণ্ড, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা ২০১২
সম্পাদক: মতিউর রহমান, সংগ্রহ ও গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান
Also Read
-
ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনা নেই ইরানের
-
যুক্তরাষ্ট্রে নিখোঁজ দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর একজনের মরদেহ উদ্ধার
-
মোজতবা খামেনির শরীরে একাধিক অস্ত্রোপচার, লাগতে পারে কৃত্রিম অঙ্গ
-
জেমস এর দেড় ঘণ্টা
-
মঞ্চে দ্যুতি ছড়ালেন তারকারা