বীরত্বসূচক খেতাবপ্রাপ্তদের তালিকা

আবদুল ওহাব, বীর প্রতীক

  • গ্রাম শ্রীমন্তপুর, ইউনিয়ন বাকশীমূল, বুড়িচং, কুমিল্লা।

  • বাবা হায়দার আলী, মা চান বানু।

  • স্ত্রী রৌশন আরা বেগম। তাঁদের দুই ছেলে ও পাঁচ মেয়ে।

  • খেতাবের সনদ নম্বর ১০৮।

আবদুল ওহাব

হবিগঞ্জের মাধবপুর থানার অন্তর্গত একটি এলাকা হরষপুর। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তেলিয়াপাড়া দখল করার পর পার্শ্ববর্তী মনতলা কমপ্লেক্স মুক্তিবাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পরিণত হয়। কমপ্লেক্সের উত্তরে মনতলা রেলস্টেশন। হরষপুর রেলস্টেশন এর দক্ষিণে। পূর্বে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সীমান্ত। তেলিয়াপাড়ার যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এরপর নিয়মিত মুক্তিবাহিনীর তিনটি কোম্পানি মনতলায় বিভিন্ন জায়গায় অবস্থান নেয়। লেফটেন্যান্ট হেলাল মোরশেদ খানের (বীর বিক্রম, পরে মেজর জেনারেল) নেতৃত্বে একটি কোম্পানি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে অবস্থান নিয়েছিল হরষপুরে। মুক্তিবাহিনীর এই দলে ছিলেন আবদুল ওহাব। ১৫ জুন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী মনতলা এলাকায় আক্রমণ শুরু করে। পাঁচ দিন একটানা সেখানে যুদ্ধ চলে।

২০ জুন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অগ্রবর্তী দল মুক্তিবাহিনীর একেবারে সামনে এসে অবস্থান নেয়। হেলিকপ্টারের সাহায্যে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান নির্ণয় করে। এরপর মুকুন্দপুর, অর্থাৎ দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি বড় দল আবদুল ওহাবদের অবস্থান লক্ষ্য করে প্রচণ্ড আক্রমণ শুরু করে। একই সঙ্গে চান্দুরার দিক থেকেও পাকিস্তানি সেনারা তাঁদের ওপর আক্রমণ করে। কিছুক্ষণ পর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী হেলিকপ্টারের সাহায্যে আবদুল ওহাবদের অবস্থানের পেছনে ছত্রীসেনা নামায়। তখন তাঁরা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ঘেরাওয়ের মধ্যে পড়ে যান।

জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ভীত না হয়ে আবদুল ওহাব ও তাঁর সহযোদ্ধারা লেফটেন্যান্ট হেলাল মোরশেদ খানের নেতৃত্বে সাহসের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যান। পরে মেজর সফিউল্লাহর (বীর উত্তম, পরে মেজর জেনারেল ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম প্রধান) নির্দেশে মুক্তিবাহিনীর অপর একটি দল পাকিস্তানি সেনাদের ওপর পাল্টা আক্রমণ চালায়। এতে পাকিস্তানি সেনারা হতবিহ্বল হয়ে পড়ে এবং পিছু হটে। ওহাবের সহযোদ্ধা দৌলা মিয়া ছিলেন তাঁদের এলএমজি ম্যান। সেদিন তিনি দুঃসাহসের সঙ্গে তাঁর এলএমজি দিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের অগ্রযাত্রা ঠেকিয়ে রাখেন। একপর্যায়ে তিনি গুরুতর আহত হন। তাঁর সঙ্গে থাকা সহযোদ্ধারা মৃত ভেবে তাঁকে সেখানে রেখেই চলে যান। পরে ওহাবসহ কয়েকজন তাঁকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন।

আবদুল ওহাব পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন। ১৯৭১ সালে কর্মরত ছিলেন দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে নায়েক (বর্তমানে করপোরাল) পদে। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে যোগ দেন প্রতিরোধযুদ্ধে। পরে পুনঃসংগঠিত হয়ে যুদ্ধ করেন ৩ নম্বর সেক্টরের অধীন নরসিংদী এলাকা ও কলকলিয়া সাব-সেক্টরে। গেরিলাযুদ্ধের পাশাপাশি সরাসরি যুদ্ধেও তিনি অংশ নেন। নরসিংদীর বেলাবতে একটি গেরিলা অপারেশনে তিনি যথেষ্ট রণনৈপুণ্য দেখান।

সূত্র: একাত্তরের বীরযোদ্ধা: খেতাব পাওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা, প্রথম খণ্ড, প্রথমা প্রকাশন, ঢাকা ২০১২

সম্পাদক: মতিউর রহমান, সংগ্রহ ও গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান