মুক্তিযুদ্ধের দিনলিপি
স্বাধীনতার জন্য আমৃত্যু লড়াই
মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পেছনে ছিল দেশ-বিদেশের বহু মানুষের একক ও মিলিত প্রচেষ্টা, অজস্র ঘটনা। এখানে রইল একাত্তরের প্রতিটি দিনের বিবরণ।
নিউইয়র্ক টাইমস ২০ নভেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলে, পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে আমৃত্যু সংগ্রাম করে হলেও বাঙালিরা স্বাধীনতা চায়। পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে এবং গ্রামাঞ্চলে ঘুরে সামগ্রিকভাবে এই ধারণাই হয়। করাচি থেকে ম্যালকম ব্রাউন এই প্রতিবেদন পাঠান।
প্রতিবেদনে ব্রাউন বলেন, হোটেল, ব্যাংক, দোকান, বাজার, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিস, বিদেশি কনস্যুলেট অফিস—সর্বত্রই রয়েছে মুক্তিবাহিনী। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে জলাভূমি বেশি। সেখানে সেনাদের পক্ষে ঢোকা কঠিন। পাকিস্তানি সেনা কর্তৃপক্ষ ভিয়েতনাম থেকে কিছু শেখেনি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, গেরিলারা সর্বত্র রাস্তা, সেতু ও জলপথ ধ্বংস করছেন। বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পেট্রল সরবরাহ বন্ধ করে দিচ্ছেন। পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের ঘরের বাইরে আসা প্রায় বন্ধ।
জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত এক বিশেষ কমিটিতে নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে আলোচনাকালে ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী কে বি অ্যান্ডারসন পূর্ববঙ্গ সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানে ইয়াহিয়া খানের প্রতি আহ্বান জানান।
শহীদ হলেন আশফাকুশ সামাদ
আশফাকুশ সামাদ ২০ নভেম্বর কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী থানার রায়গঞ্জ দখলের যুদ্ধে শহীদ হন। ১৯ নভেম্বর রাতে আশফাকুশ সামাদের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা সেখানে পৌঁছে পাকিস্তানি সেনাদের ফাঁদে পড়ে যান। এ বিপর্যয়ে বিচলিত না হয়ে সামাদ সাহসের সঙ্গে পাকিস্তানি সেনাদের মোকাবিলা করেন। একপর্যায়ে একটি গুলি তাঁর মাথা ভেদ করলে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রেই শাহাদাতবরণ করেন। এ যুদ্ধে আরও শহীদ হন কবীর আহমেদ (ইপিআর সিপাহি), আবদুল আজিজসহ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা।
২ নম্বর সেক্টরের গণবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধারা নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের বামনিতে রাজাকারদের একটি শক্ত ঘাঁটিতে আক্রমণ চালান। রাজাকারদের পাল্টা আক্রমণে মুক্তিযোদ্ধাদের দলনেতা অহিদুর রহমান অদুদ শহীদ এবং কয়েকজন আহত হন।
৪ ও ৫ নম্বর সেক্টরের মুক্তিবাহিনীর সম্মিলিত শক্তি এবং ভারতীয় বাহিনীর ৫৯ মাউন্টেন ব্রিগেড ও ৮১ মাউন্টেন ব্রিগেড যৌথভাবে সিলেট দখলের পরিকল্পনা করে। অক্টোবরের মাঝামাঝি জেড ফোর্স তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে জেড ফোর্সের অধীন প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ভারতের জালালপুর থেকে আন্তর্জাতিক সীমানা পেরিয়ে সুরমা নদী অতিক্রম করে আটগ্রাম-চরখাই-সিলেট অক্ষের চারগ্রামে পৌঁছায়। ১৫ নভেম্বর প্রথম ইস্ট বেঙ্গল সাফল্যের সঙ্গে জকিগঞ্জ দখল করে। এরপর তারা চারগ্রামে আগের অক্ষে ফিরে এলে পাকিস্তানি বাহিনী জকিগঞ্জ পুনর্দখল করে। জকিগঞ্জ চূড়ান্তভাবে শত্রুমুক্ত করতে ভারতীয় বাহিনীর সহযোগিতায় মুক্তিযোদ্ধারা তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে ২০ নভেম্বর সন্ধ্যায় আবার জকিগঞ্জে আক্রমণ করেন। রাতভর যুদ্ধ চলতে থাকে।
৮ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা প্রচণ্ড যুদ্ধের পর সাতক্ষীরার দেবহাটার বিরাট একটি অঞ্চল মুক্ত করেন। যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত পাকিস্তানি বাহিনী সাতক্ষীরা শহরের দিকে পিছু হটে। দেবহাটার মুক্তাঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধারা স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়িয়ে দিয়ে সাতক্ষীরার দিকে এগিয়ে যান।
সাতক্ষীরার তালা অঞ্চলে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধে বেশ কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা এবং নিরীহ গ্রামবাসী শহীদ হন। এ ছাড়া কালিগঞ্জ ওয়াপদা কলোনিতে মুক্তিযোদ্ধাদের হামলায় সেখানে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনারা পিছু হটে। দিনটি কালিগঞ্জ বিজয় দিবস হিসেবে পালিত হয়।
মুক্তিযুদ্ধে ঈদের দিন
১৯৭১ সালের এই দিনটি ছিল ঈদ। বাংলাদেশ সরকারের কার্যালয়ের সামনে ঈদের জামাতে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মুক্তিবাহিনীর প্রধান কর্নেল এম এ জি ওসমানীসহ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা।
ঈদের দিন লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস আই নুরুন্নবী খান বীর বিক্রম তৃতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের ডেল্টা, ইকো এবং ব্যাটালিয়ন হেড কোয়ার্টার কোম্পানির সৈন্যদের নিয়ে সিলেটের সীমান্তবর্তী এলাকায় পাকিস্তানিদের শক্ত ঘাঁটি রাধানগরকে ঘিরে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলছিলেন। তিনি লিখেছেন, ‘কোনো অবস্থানেই মুক্তিযোদ্ধারা জামাতে ঈদের নামাজ পড়ার সুযোগ পায়নি।...নতুন জামাকাপড় পরা বা মিষ্টি-সুজি-সেমাই খাওয়া বা উন্নতমানের খাবারেরও কোনো ব্যবস্থা ছিল না। দুপুরের দিকে দূরবর্তী গ্রাম থেকে স্বেচ্ছাসেবকেরা কিছুটা উন্নতমানের খিচুড়ি বয়ে নিয়ে এসেছিল।’
২০ নভেম্বর বেলা একটার দিকে পাকিস্তানি সেনারা নুরুন্নবী খানদের ছাত্তার গ্রামের প্রতিরক্ষা অবস্থানে ভয়ংকর হামলা চালায়। সুবেদার আলী আকবর ছিলেন এলাকার প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত। নুরুন্নবী খান বাংকারে বসে ঈদের খিচুড়ি খাচ্ছিলেন। তিনি দ্রুত সুবেদার বদি এবং তাঁর প্লাটুনের দুটি সেকশনকে সঙ্গে নিয়ে আলী আকবরের অবস্থানে পৌঁছান। বাইনোকুলারে দেখতে পান, পাকিস্তানিদের বিশাল দল তাঁদের অবস্থানের দিকে এগিয়ে আসছে। তাঁরা গোলা নিক্ষেপ করতে শুরু করলে পাকিস্তানিরা পিছু হটতে শুরু করে।
ঈদের রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া কারাগারে বন্দী ৩৮ জন স্বাধীনতাকামীকে শহরের পৈরতলা খালপাড়ে হত্যা করে পাকিস্তানি বাহিনী। ২৭ অক্টোবর সিরু মিয়া দারোগা, তাঁর ছেলে কামাল, দাউদকান্দি থানা বিএলএফ কমান্ডার শহিদ নজরুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজনকে আটক করে পাকিস্তানিদের হাতে তুলে দিয়েছিল রাজাকাররা। তাঁদের অকথ্য নির্যাতন করে হত্যা করা হয়।
সূত্র: আনন্দবাজার পত্রিকা, কলকাতা, ভারত, ২২ নভেম্বর ১৯৭১; ইন্ডিয়া নিউজ, ভারত, ২০ নভেম্বর, ১৯৭১; বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন, ‘সাতক্ষীরা জেলা ও একাত্তরের ঈদের এই দিনে’, কর্নেল নুরুন্নবী খান বীর বিক্রম
গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান
Also Read
-
ঘটনার ১৯ দিনের মাথায় দুজনের মৃত্যুদণ্ড, পর্যালোচনায় আদালত যা বললেন
-
প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া সময়ে কাঙ্ক্ষিত রায় পেয়েছি, দ্রুত কার্যকর চাই, বললেন বাবা
-
উচ্চ আদালতে গেলেও এই রায় বহাল থাকবে, আশা আইনমন্ত্রীর
-
৩৭৫ সিসির মোটরসাইকেল আমদানির সুযোগ আসছে, নতুন নীতি নিয়ে প্রশ্ন
-
‘আমরা তেলাপোকা, আমরা থাকব’