মুক্তিযুদ্ধের দিনলিপি

মুজিবনগরে বৈঠক গণপ্রতিনিধিদের

মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পেছনে ছিল দেশ–বিদেশের বহু মানুষের একক ও মিলিত প্রচেষ্টা, অজস্র ঘটনাধারা। এখানে রইল একাত্তরের প্রতিটি দিনের বিবরণ।

মুজিবনগরে ৫ জুলাই বাংলাদেশের গণপ্রতিনিধিদের অধিবেশন শুরু হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদসহ মন্ত্রিসভার সব সদস্য উপস্থিত ছিলেন। দিনভর তাঁরা পূর্বনির্ধারিত কার্যসূচি নিয়ে রুদ্ধদ্বার আলোচনা করেন। অধিবেশনে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যরা যোগ দেন।

মুক্তিযোদ্ধারা অবরুদ্ধ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে আক্রমণ পরিচালনা করেন। কয়েকটি জায়গায় বড় ধরনের যুদ্ধ হয়। ময়মনসিংহের ভালুকার ভাউলিয়াবাজুর যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। অন্যদিকে ১৩ জন মুক্তিযোদ্ধাও শহীদ হন। নেত্রকোনা জেলার নাজিরপুর বাজারে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের তুমুল যুদ্ধ হয়। যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার নাজমুল হক, জামাল উদ্দিনসহ আটজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। এ ছাড়া কুমিল্লার মনোরা সেতু এলাকায় এবং সুনামগঞ্জের মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনীর মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।

চাপ দিয়ে সিদ্ধান্ত নয়

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী দিল্লিতে শাসক দল নব কংগ্রেসের সংসদীয় দলের কর্মপরিষদে বাংলাদেশ সম্পর্কে আলোচনায় যোগ দিয়ে বলেন, যথাযথ সময় বুঝেই তাঁর সরকার বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবে। ভারত একেবারেই এটা চায় না, কেউ দোষারোপ করুক যে তারা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেছে।

কর্মপরিষদে এদিনের আলোচনায় মনোভাবের পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। প্রায় সবাই বলেন, এখনই এমন কিছু করা ঠিক হবে না, যাতে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ লেগে যেতে পারে। তাঁরা বলেন, বাংলাদেশের মুক্তির লড়াই সে দেশের জনগণকেই চালাতে হবে। তবে তাদের সমর্থনে জনমত সংগঠনে ভারতকে সর্বাত্মক চেষ্টা করে যেতে হবে। এ সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী।

ভারতের কেন্দ্রীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিং লোকসভায় এক প্রশ্নের উত্তরে বলেন, বাংলাদেশে রাজনৈতিক সমাধানের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। প্রত্যাশিত রাজনৈতিক সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে ভারত সরকার কোনো সাড়া পাচ্ছে না। তবে সরকার চেষ্টা চালিয়ে যাবে এবং অন্যান্য পদক্ষেপও নেওয়া হবে। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, একজন ব্রিটিশ এমপি সুপারিশ করেছেন, মানবতার বিরুদ্ধে গণহত্যার অপরাধে অপরাধী পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বিচারের জন্য আন্তর্জাতিক বিচারকমণ্ডলী নিয়ে একটি কমিটি গঠিত হোক।

ভারতে নিযুক্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত পেগভ দিল্লিতে পররাষ্ট্রসচিব টি এন কাউলের সঙ্গে দেখা করে জানান, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান তাঁর সেনাবাহিনীকে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার পর সোভিয়েত ইউনিয়ন পাকিস্তানকে কোনো অস্ত্রশস্ত্র বা যন্ত্রাংশ সরবরাহ করেনি।

সিপিএমের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি সদ্য সমাপ্ত অধিবেশনের পর কলকাতায় এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের ব্যাপারে দলের নীতির ব্যাখ্যা করা হয়। নীতি ব্যাখ্যা করেন প্রমোদ দাশগুপ্ত, জ্যোতি বসু ও হরেকৃষ্ণ কোঙার। তাঁরা বলেন, সিপিএম বাংলাদেশের ব্যাপারে পাকিস্তানের সঙ্গে লড়াই করার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে। তবে সিপিএম চায় ভারত সরকার অবিলম্বে বাংলাদেশ সরকারকে স্বীকৃতি এবং বাংলাদেশের সব শ্রেণির মুক্তিযোদ্ধাকে অস্ত্রশস্ত্রসহ সব ধরনের সাহায্য দিক।

বাংলাদেশে ইয়াহিয়ার সামরিক বাহিনীর গণহত্যার বিচারে কলকাতায় জনতার অভিনব গণ-আদালত বসে। সন্ধ্যা পৌনে ছয়টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে কলকাতার ২০টি গুরুত্বপূর্ণ পথের মোড়ে একই সঙ্গে এই বিচারসভা বসে। এর আয়োজন করে ভারতের শাসক দল নব কংগ্রেসের কলকাতা কমিটি। আদালত ইয়াহিয়া ও ভুট্টোকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে দণ্ডিত করে এবং অবিলম্বে তাদের গ্রেপ্তারের জন্য পরোয়ানা জারি করে। এই রায় ঘোষণার পর বিচারক আরেকটি রায় ঘোষণা করে বলেন, ঘুমন্ত বিশ্ববিবেকের পরিবর্তে নতুন বিশ্ববিবেকের জন্ম হবে। এরপর আদালত ঘুমন্ত বিশ্ববিবেককে চরম দণ্ডে দণ্ডিত করেন। রায় ঘোষণা মাত্র ঘুমন্ত বিশ্ববিবেকের কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়।

লন্ডনে ২১ জুন যুক্তরাজ্য ও ভারতের যুক্ত বিবৃতির ব্যাপারে আপত্তি জানিয়ে পাকিস্তান ইসলামাবাদে ব্রিটিশ হাইকমিশনারকে আনুষ্ঠানিকভাবে একটি নোট দেয়। নোটে উল্লেখ করা হয়, ভারত পূর্ব পাকিস্তানে তার নিজস্ব পছন্দমতো একটি রাজনৈতিক সমাধান চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। সে বিবৃতিতে যুক্তরাজ্যও ভারতীয় ফর্মুলাকেই সমর্থন জানিয়েছে। এটি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে অযথা হস্তক্ষেপ। এই পরিস্থিতিতে প্রতিবাদ জানানো ছাড়া পাকিস্তানের কাছে আর কোনো বিকল্প নেই।

পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো করাচিতে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, পাক-ভারত উপমহাদেশের পরিস্থিতিদৃষ্টে তিনি চিন্তিত। ভারতীয় হুমকি থেকে থাকলে দেশের বর্তমান সংকট অবস্থার সমাধানকল্পে জনগণের প্রতিনিধিদের কাছেই দায়িত্ব ন্যস্ত হওয়া উচিত।

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর দুই, পাঁচ ও এগারো; ইত্তেফাক, ৬, ৭ ও ৮ জুলাই ১৯৭১; আনন্দবাজার পত্রিকা, ভারত, ৬ ও ৭ জুলাই ১৯৭১

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান