মুক্তিযুদ্ধের দিনলিপি
মুক্তিযোদ্ধাদের চালনা বন্দরে অভিযান
মুক্তিবাহিনীর নৌ কমান্ডোরা ২৪ সেপ্টেম্বর চালনা বন্দরে মাইন বিস্ফোরণ ঘটিয়ে একটি বিদেশি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত করেন। জাহাজটি যুক্তরাষ্ট্র থেকে খাদ্যশস্য নিয়ে এসেছিল। পাকিস্তান সরকারের একজন মুখপাত্র ঘটনাটি স্বীকার করে বলেন, ভারতীয় এজেন্টরা (মুক্তিযোদ্ধা) ওই জাহাজের ওপর আক্রমণ চালায়।
বিবিসির খবরে বলা হয়, পূর্ব পাকিস্তানের একজন সরকারি মুখপাত্র বলেছেন, গঙ্গা বদ্বীপের চালনায় একটি মার্কিন জাহাজ মাইন বিস্ফোরণে ধ্বংস হয়। জাহাজটি পূর্ব পাকিস্তানে খাদ্যসামগ্রী নিয়ে এসেছিল। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের আরেকটি জাহাজও চালনা বন্দরে বোমা বিস্ফোরণে ধ্বংস হয়।
পাকিস্তানি সেনারা এ দিন অনেকগুলো নৌকায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের দিকে রওনা হলে বিদ্যাকুট গ্রামের কাছে মুক্তিযোদ্ধারা তাদের অতর্কিত আক্রমণ করেন। এ আক্রমণে কয়েকটি নৌকা ডুবে গেলে কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকার হতাহত হয়।
৩ নম্বর সেক্টরের একদল মুক্তিযোদ্ধা হবিগঞ্জ জেলায় সিন্দুরখান-কালেঙ্গার সড়কসংলগ্ন কয়েকটি ছোট ছোট টিলায় অবস্থান নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর জন্য অপেক্ষায় থাকেন। এ পথে ২৫ জন রাজাকারসহ কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা কালেঙ্গার দিকে এগোতে থাকলে অ্যামবুশের আওতায় চলে আসে। তখন মুক্তিযোদ্ধারা তাদের ওপর হামলা করেন। পরিখার মধ্যে সুরক্ষিত মুক্তিযোদ্ধাদের পাল্টা আক্রমণ চালিয়েও পাকিস্তানি সেনারা সুবিধা করতে পারেনি। একজন কর্মকর্তাসহ বেশ কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা হতাহত হয়। মুক্তিযোদ্ধা নায়েক আবদুল মান্নান এ দিন শহীদ হন।
ধর্মঘর নামে একটি স্থানে এই সেক্টরের আরেক দল মুক্তিযোদ্ধার আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনীর একজন জুনিয়র কমিশন্ড অফিসারসহ কয়েকজন সেনা হতাহত হয়।
৪ নম্বর সেক্টরের কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা খড়মপুরে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি দলকে আক্রমণ করে। পাকিস্তানি সেনারা ৩ ইঞ্চি মর্টার, এমজি ও এলএমজির সাহায্যে পাল্টা আক্রমণ চালায়। যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর কয়েকজন হতাহত হয়।
৮ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর একটি ছোট দলকে এ দিন অ্যামবুশ করলে কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা হতাহত হয়।
বার্তা সংস্থা এপিপি এ দিন জানায়, সাবেক প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য এবং কাউন্সিল মুসলিম লীগ নেতা নুরুল হুদা কয়েক দিন আগে ময়মনসিংহে নিজ বাড়িতে নিহত হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী তৎপরতা এবং শান্তি কমিটির নামে এলাকায় সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন চালানোর কারণে গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযানে তিনি নিহত হন।
অন্য রাষ্ট্রেরও ভূমিকা দরকার
ভারতের কেন্দ্রীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার সিং এই দিন নিউইয়র্কে জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্টের সঙ্গে দেখা করে বলেন, বাংলাদেশ সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানে ভারতের পক্ষে একা কিছু করা সম্ভব নয়। অন্য রাষ্ট্রেরও এ ব্যাপারে ভূমিকা রাখা উচিত। তিনি অভিযোগ করে বলেন, পাকিস্তান ইচ্ছাকৃতভাবে পুরো বিষয় ঘোলাটে করে তুলছে। ভারতের বিরুদ্ধে দোষারোপ করে তারা বিশ্বের দৃষ্টি অন্যত্র সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের আচরণই প্রমাণ করে বাংলাদেশ সমস্যার সমাধানের ইচ্ছা তার নেই।
জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে যোগদানকারী পাকিস্তানি প্রতিনিধিদলের সদস্য এ টি সাদী বলেন, বিচ্ছিন্নতার কারণে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ ছিল অনিবার্য। দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনতে যতটুকু না করলে নয়, সেনাবাহিনী তা-ই করছে।
পাকিস্তানপন্থীদের তৎপরতা
রাজধানী ঢাকার শান্তি কমিটির তেজগাঁও শাখা ২৪ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের অনুগত গভর্নর ডা. আবদুল মোত্তালিব মালিকের মন্ত্রিসভার নবনিযুক্ত মন্ত্রীদের সংবর্ধনা দেয়। জামায়াতে ইসলামীর ডেপুটি আমির মাওলানা আবদুর রহিমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভায় মাওলানা আব্বাস আলী খান, অংশু প্রু চৌধুরীসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমির গোলাম আযম এ দিন এক ঘোষণায় পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর বৈঠক আহ্বান করেন। ঘোষণায় বলা হয়, বৈঠকে ২ অক্টোবর দেশের বর্তমান পরিস্থিতি, উপনির্বাচন এবং দলীয় কর্মীদের করণীয় নিয়ে আলোচনা করা হবে।
সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: দলিলপত্র, দশম খণ্ড; ইত্তেফাক ও দৈনিক পাকিস্তান, ঢাকা, ২৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭১; আনন্দবাজার পত্রিকা ও যুগান্তর, কলকাতা, ভারত, ২৫ ও ২৬ সেপ্টেম্বর ১৯৭১।
গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান
Also Read
-
এক রাতেই ইরানকে ‘গুঁড়িয়ে’ দেওয়া সম্ভব, আগামীকালই সেই রাত হতে পারে: ট্রাম্প
-
ইরানের বিক্ষোভকারীদের দিতে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র পাওয়ার কথা অস্বীকার কুর্দিদের
-
হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া নিয়ে ওমান ও ইরানের বৈঠক
-
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলে ভবন ধসে নিহত ৪, মধ্যাঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি
-
৪ হাজার কোটি টাকায় কেনা ইভিএম এখন গলার কাঁটা