মুক্তিযুদ্ধের দিনলিপি
বাঙালি কূটনীতিকদের সরকারের নির্দেশ
চাকরিসূত্রে বিদেশে কর্মরত পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বাঙালি কূটনীতিকদের প্রতি বাংলাদেশ সরকার ১৫ সেপ্টেম্বর একটি নির্দেশ জারি করে। আগামী ১৫ দিনের মধ্যে বাংলাদেশের প্রতি তাঁদের আনুগত্য প্রকাশের আহ্বান জানিয়ে নির্দেশে বলা হয়, এই সময়ের মধ্যে আনুগত্য প্রকাশ না করলে তাঁদের বিশ্বাসঘাতক বলে চিহ্নিত করা হবে। বিভিন্ন দেশের রাজধানী ও বড় শহরে নির্দেশটি পাঠানো হয়। চীনে রাষ্ট্রদূত হিসেবে কর্মরত বাঙালি কায়সার চৌধুরীর কাছেও নির্দেশটি পাঠানো হয়।
দিল্লিতে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, জাতিসংঘগামী বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলোচনার জন্য ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারক কমিটির চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশ বিষয়ে বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত ডি পি ধর ১৬ সেপ্টেম্বর মুজিবনগরে যাবেন। ডি পি ধর এরই মধ্যে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের ব্যাপারে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন।
এই প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন বাংলাদেশ সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদ। দলে নবগঠিত উপদেষ্টা কমিটির অন্যতম সদস্য ওয়ালী ন্যাপের নেতা অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ এবং আওয়ামী লীগের নেতা ফণীভূষণ মজুমদার থাকবেন। ১৮ সেপ্টেম্বর দলটি নিউইয়র্ক রওনা দেবে।
আবু সাঈদ চৌধুরীর জনসংযোগ
ডেনমার্ক সফররত যুক্তরাজ্য ও বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের দূত বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী এ দিন দেশটির বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সদস্যদের সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম নিয়ে আলোচনা করেন। মুক্তিসংগ্রামের প্রতি সহানুভূতি জানিয়ে তাঁরা যথাসম্ভব সাহায্যের আশ্বাস দেন। বিচারপতি চৌধুরী পরে সংসদের স্পিকারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে তিনি বাংলাদেশ সংগ্রামের সাফল্য কামনা করেন। বিচারপতি চৌধুরী সংসদের বৈদেশিক কমিটির সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন। কমিটির সভাপতি কিয়েল অলসেন বাংলাদেশকে সব ধরনের সাহায্যের আশ্বাস দেন।
আবু সাঈদ চৌধুরী স্থানীয় টেলিভিশনেও সাক্ষাৎকার দেন। টিভি স্টেশনে গিয়ে তিনি জানতে পারেন, পাকিস্তান সরকার ডেনমার্কের একজন
ব্যবসায়ীকে অস্ত্র সরবরাহের অনুরোধ জানিয়েছে। সাক্ষাৎকারে এ ব্যাপারে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ করার জন্য ডেনিশ সরকারের কাছে আবেদন জানান। সাক্ষাৎকারটি প্রচারের পর সংসদের বৈদেশিক কমিটির প্রচেষ্টায় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটি যুদ্ধ পরিস্থিতিতে পাকিস্তানকে অস্ত্র সরবরাহ করতে অসম্মতি জানায়।
ফিলিপাইন সরকার এদিন পাকিস্তানের পক্ষত্যাগী বাঙালি রাষ্ট্রদূত খুররম খান পন্নীকে জানায়, বাংলাদেশের পক্ষে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হলে তাঁকে ফিলিপাইন থেকে বহিষ্কার করা হবে।
বাংলাদেশ প্রশ্নে সিঙ্গাপুরের একাত্মতা
সিঙ্গাপুর সফররত ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি এই দিন দেশটির প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাজা রত্নমের সঙ্গে বৈঠক করেন। লি কুয়ান ইউ ভারতের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন।
ইরানের রাজধানী তেহরানে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া এবং রেজা শাহ পাহলভির মধ্যে পাকিস্তান-ভারত পরিস্থিতি নিয়ে দুই দিনব্যাপী আলোচনা হয়। আলোচনা শেষে যুক্ত ইশতেহারে ইরানের শাহ পাকিস্তানের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন।
গেরিলা অভিযান
১ নম্বর সেক্টরের একদল মুক্তিযোদ্ধা এ দিন ফেনীর পরশুরামের আমজাদহাট এলাকায় পাকিস্তানি সেনাদের অ্যামবুশ করেন। পাকিস্তানি সেনারা পাল্টা আক্রমণ চালালে দুই ঘণ্টার বেশি সময় যুদ্ধ চলে। মুক্তিযোদ্ধা নাদিরুজ্জামান দুঃসাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করে তাঁর সতীর্থদের অ্যামবুশ অবস্থান ত্যাগ করতে সাহায্য করেন। এ যুদ্ধে কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা হতাহত হয়। একজন মুক্তিযোদ্ধাও আহত হন।
এই সেক্টরের আরেক দল মুক্তিযোদ্ধা লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জ প্রতাপ হাইস্কুলে পাকিস্তানি অনুগত পুলিশ ও রাজাকারদের ক্যাম্প আক্রমণ করেন। কয়েকজন পুলিশ ও রাজাকার হতাহত হয়।
২ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা এ দিন শালদা নদী এলাকায় পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে তীব্র হামলা করলে কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা হতাহত হয়।
৮ নম্বর সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল মাগুরা জেলার কুরাগাছি ইউনিয়ন কাউন্সিল অফিসে অবস্থানরত রাজাকারদের একটি দলের ওপর অতর্কিত আক্রমণ করলে কয়েকজন হতাহত হয়।
গোপালগঞ্জে হেমায়েত বাহিনীর একদল মুক্তিযোদ্ধা কোটালীপাড়া থানায় আক্রমণ করলে মজুত করা প্রচুর খাদ্যশস্য ও গোলাবারুদ তাঁদের হস্তগত হয়।
খুলনার পাইকগাছা থানার বাকা গ্রামে পাকিস্তানি সেনারা গানবোটের সাহায্যে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানে আকস্মিক আক্রমণ চালায়। আক্রমণের তীব্রতায় মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটতে বাধ্য হন। পাঁচজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।
৯ নম্বর সেক্টরের একদল মুক্তিযোদ্ধা বরিশালের বানারীপাড়া থানা আক্রমণ করেন। পাকিস্তানি বাহিনীর প্রবল প্রতিরোধের মুখে মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটতে বাধ্য হন।
ময়মনসিংহের কুমারঘাট, মাচারঘাট, বান্দিয়া ও নিমুরী এলাকায় যুদ্ধে কয়েকজন রাজাকার মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে হতাহত হয়।
সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর এক, দুই, আট, নয় ও এগারো; স্বাধীনতাসংগ্রামে প্রবাসী বাঙালি, আবদুল মতিন, রেডিক্যাল এশিয়া পাবলিকেশনস, লন্ডন, যুক্তরাজ্য; ইভনিং স্ট্যান্ডার্ড, ১৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৭১; আনন্দবাজার পত্রিকা ও যুগান্তর, কলকাতা, ভারত, ১৬ ও ১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭১
গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান।
Also Read
-
পাকিস্তানের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির আলোচনায় কুয়েত, চায় সেনা ও যুদ্ধবিমান
-
যুক্তরাজ্যের নতুন প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম, বললেন, ‘আই হ্যাভ আ প্ল্যান’
-
শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের অনুরোধ খতিয়ে দেখা হচ্ছে: জয়সোয়াল
-
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তি করে অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকার: নুরুল হক
-
‘বহুবার রাজনৈতিক দলগুলোকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি’