মুক্তিযুদ্ধের দিনলিপি

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য

মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পেছনে ছিল দেশ-বিদেশের বহু মানুষের একক ও মিলিত প্রচেষ্টা, অজস্র ঘটনা। এখানে রইল একাত্তরের প্রতিটি দিনের বিবরণ।

বার্তা সংস্থা এএফপি করাচির ওয়াকিবহাল মহল সূত্রে ১ সেপ্টেম্বর খবর পরিবেশন করে, পাকিস্তানে বন্দী বাংলাদেশের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার শুরু হতে আরও কিছুদিন সময় লাগবে। ১১ আগস্ট তাঁর বিচার শুরু হলেও কোনো ঘোষণা ছাড়াই সেই বিচার বন্ধ রাখা হয়। কয়েক দিন পর জানানো হয়, শেখ মুজিবুর রহমান বিশিষ্ট আইনজীবী এ কে ব্রোহির সাহায্য পাবেন। তবে ব্রোহি রাওয়ালপিন্ডিতে আলোচনার জন্য এলে তাঁকে বিচার কবে শুরু হবে, তা জানানো হয়নি।

করাচির ডেইলি নিউজ পত্রিকায় ‘আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে মুজিবের বিচার হবে’ শিরোনামে প্রকাশিত এক খবরে বলা হয়, পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত আগা শাহি ৩১ আগস্ট দেশে আস্থা বাড়াতে পাকিস্তান সরকারের নতুন পদক্ষেপগুলো জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্টকে অবহিত করেছেন। এরপর তিনি নিউইয়র্কে সংবাদদাতাদের বলেন, পদক্ষেপগুলো আগামী দু-তিন সপ্তাহের মধ্যে বাস্তবায়ন করা হবে।

শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার সম্পর্কে তিনি বলেন, ১১ আগস্ট তাঁর বিচার শুরু হয়েছে, আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। তাঁকে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া এবং সহিংসতা উসকে দেওয়ার দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছে। শেখ মুজিবের বিচার কোথায় হচ্ছে এ ব্যাপারে রাষ্ট্রদূত মন্তব্য করেননি; তবে বলেছেন, শেখ মুজিবের পছন্দ অনুযায়ী পাকিস্তানের একজন সেরা সাংবিধানিক আইনজীবী এ কে ব্রোহি তাঁর পক্ষে এ মামলায় অংশ নিচ্ছেন।

ফ্রান্সের দৈনিক পত্রিকা লা ফিগারোর ১ সেপ্টেম্বর সংখ্যায় প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান বলেন, শেখ মুজিব কারাগারে আছেন এবং জীবিত আছেন। তবে তিনি কোন কারাগারে আছেন, তা তিনি জানেন না। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট কি কোন বন্দী কোন জেলে আছেন, তা জানেন? ইয়াহিয়া অভিযোগ করেন, শরণার্থীদের ভারত নিজের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে কাজে লাগাচ্ছে।

গভর্নর পরিবর্তন

যুক্তরাজ্য ও বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের দূত বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ১ সেপ্টেম্বর লন্ডনে বলেন, বাংলাদেশে পাকিস্তানের গভর্নর বদলে বাঙালির কিছু যায় আসে না। পূর্ব পাকিস্তানের নতুন বেসামরিক গভর্নর হিসেবে ডা. আবদুল মোত্তালিব মালিককে নিয়োগের ঘোষণার পর তিনি এই মন্তব্য করেন।

বাংলাদেশের পক্ষে জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে যুক্তরাজ্য ও বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের দূত বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী এই দিন লন্ডন থেকে নরওয়ের রাজধানী অসলো সফরে যান। নরওয়ের টেলিভিশন তাঁর একটি সাক্ষাৎকার নিয়ে এই দিনই তা প্রচার করে।

ব্রিটেনের দ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকায় পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডি থেকে প্রাপ্ত এক সংবাদে বলা হয়, লন্ডনে বাংলাদেশ মিশন স্থাপন করে ‘বিদ্রোহী’ বাঙালিরা পাকিস্তানবিরোধী কার্যকলাপ পরিচালনা করছে বলে পাকিস্তান সরকার ব্রিটিশ হাইকমিশনারের কাছে প্রতিবাদ জানিয়েছে। প্রতিবাদে বলা হয়েছে, ব্রিটেন পূর্ব পাকিস্তানের বিদ্রোহীদের স্বীকৃতি দেওয়া দেয়নি এবং তাদের অফিস স্থাপনের ব্যাপারে বাধা দেওয়া সম্ভব নয় বলে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ যে ব্যাখ্যা দিয়েছে, তাও গ্রহণযোগ্য নয়।

সামরিক কর্তৃপক্ষের নির্দেশ

পাকিস্তানের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এই দিন ৭৭ নম্বর সামরিক আদেশ পুনর্গঠন করে ৮৯ নম্বর বিধি জারি করে। আদেশে বলা হয়, কোনো লোক এমন কোনো গুজব বা সামরিক আইনের সমালোচনা করতে পারবে না, যাতে পাকিস্তানের অখণ্ডতা কিংবা সংহতি বিনষ্ট হয়।

সামরিক কর্তৃপক্ষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক, মোজাফ্ফর আহমদ চৌধুরী, খান সারওয়ার মুরশিদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মাযহারুল ইসলাম, বাংলা একাডেমির আবু জাফর শামসুদ্দিন এবং আরও ১৩ জন সিএসপি কর্মকর্তাকে ৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সামরিক আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয়।

গেরিলা অভিযান

মুক্তিবাহিনীর ২ নম্বর সেক্টরের একদল মুক্তিযোদ্ধা এ দিন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মন্দভাগ ও নারায়ণপুরে পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থানের ওপর হামলা চালিয়ে দু-তিনটি বাংকার ধ্বংস এবং কয়েকজন পাকিস্তানি সেনাকে হতাহত করে। চালনাতেও মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকার হতাহত হয়।

২ নম্বর সেক্টরের গেরিলা মুক্তিযোদ্ধাদের আরেকটি দল ঢাকা-কুমিল্লা সড়কে দুটি সেতু বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ঢাকা-কুমিল্লা যোগাযোগ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

ঢাকার গেরিলা মুক্তিযোদ্ধারা আজিমপুরে আক্রমণ চালিয়ে রাজাকারদের হতাহত করে। আরেকটি গেরিলা দল টঙ্গীতে রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণ করলে কয়েকজন রাজাকার হতাহত হয়।

মুক্তিবাহিনীর ৮ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি সেনাদের রঘুনাথপুর ঘাঁটিতে মর্টারের আক্রমণ চালান। আরেকটি দল পাকিস্তানি সেনাদের মহেশকান্দি ঘাঁটিতে হামলা করে। যুদ্ধে কয়েকজন পাকিস্তানি সেনা হতাহত হয়।

মুক্তিবাহিনীর ১১ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধারা ময়মনসিংহের ভালুকায় পাকিস্তানি সেনা এবং রাজাকারদের ঘাঁটি আক্রমণ করলে কয়েকজন রাজাকার হতাহত হয়।

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর দুই, আট ও এগারো; স্বাধীনতাসংগ্রামে প্রবাসী বাঙালি, আবদুল মতিন, র‌্যাডিক্যাল এশিয়া পাবলিকেশনস, লন্ডন, ব্রিটেন; দ্য টেলিগ্রাফ, লন্ডন, যুক্তরাজ্য, ১ সেপ্টেম্বর ১৯৭১; ডেইলি নিউজ, করাচি, পাকিস্তান; আনন্দবাজার পত্রিকা ও যুগান্তর, ভারত, ২ ও ৩ সেপ্টেম্বর ১৯৭১

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান