মুক্তিযুদ্ধের দিনলিপি

পাকিস্তানের সামনে সংকটপূর্ণ দিন

মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পেছনে ছিল দেশ–বিদেশের বহু মানুষের একক ও মিলিত প্রচেষ্টা, অজস্র ঘটনাধারা। এখানে রইল একাত্তরের প্রতিটি দিনের বিবরণ।

তেহেরিক ইশতিকলাল পার্টির আহ্বায়ক এয়ার মার্শাল (অব.) আসগর খান অবরুদ্ধ বাংলাদেশে এক সপ্তাহের সফর শেষে ঢাকা ছাড়ার আগে দীর্ঘ এক বিবৃতি দেন। তিনি বলেন, পাকিস্তানে এখন কে সরকার গঠন করবে, সেটি বড় সমস্যা নয়; সমস্যা হচ্ছে দেশে আদৌ গণতন্ত্র টিকে থাকবে কি না এবং আসলেই কোনো সরকার গঠন করা যাবে কি না। সরকারকে জনগণের ন্যায্য দাবিদাওয়া অবশ্যই মিটিয়ে দিতে হবে। পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ প্রশ্নে আগামী তিনটি মাস অত্যন্ত ক্রান্তিকাল ও সংকটপূর্ণ।

৪ জুলাই পাকিস্তান যুক্তরাজ্যের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট, রেডিও ও সংবাদপত্রে বাংলাদেশের পক্ষে এবং পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রচারণার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। প্রতিবাদলিপিতে তারা ব্রিটিশ সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলে, লন্ডনে বাংলাদেশ অ্যাকশন কমিটির মাধ্যমে পাকিস্তানের ঐক্য ও সংহতি বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যে দায়িত্বপূর্ণ ব্রিটিশ নাগরিক ও বাঙালিরা কার্যকলাপ চালাচ্ছে। বাংলাদেশে পাঠানোর জন্য যুক্তরাজ্যে অস্ত্রশস্ত্র কিনতে তহবিল সংগ্রহ করা হচ্ছে।

প্রতিবাদলিপিতে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যার অ্যালেক ডগলাস হোমের ২৩ জুনের বিবৃতিকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপের শামিল বলে উল্লেখ করা হয়। ডগলাস হোম বিবৃতিতে বলেছিলেন, রাজনৈতিক সমাধানের দিকে প্রকৃত উন্নতির জোরালো প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানকে নতুন করে কোনো ব্রিটিশ সাহায্য দেওয়া হবে না।

বাংলাদেশের সমর্থনে গণসত্যাগ্রহ

ভারতীয় জনসংঘের সভাপতি অটলবিহারি বাজপেয়ি উদয়পুর দলের সাধারণ পরিষদের বৈঠকে বাংলাদেশ-সংক্রান্ত প্রস্তাবের ওপর আলোচনাকালে ঘোষণা দেন, বাংলাদেশকে স্বীকৃতি এবং স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারকে সামরিক সাহায্যসহ সব রকম সাহায্য দিতে ভারত সরকারকে বাধ্য করার জন্য জনসংঘ ১ আগস্ট থেকে দিল্লিতে গণসত্যাগ্রহ শুরু করবে।

বাজপেয়ি বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশকে যুক্ত করার দাবি জানানো তাঁদের অভিপ্রায় নয়। তবে শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর অনুসারীরা যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে তাঁরা খুশি হবেন। কারণ, তাঁরা অখণ্ড ভারতের স্বপ্ন দেখেন। তবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্পকে৴ সেখানকার জনগণই সিদ্ধান্ত নেবেন। তাঁরা স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবেই থাকতে চাইলে তাঁদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখা হবে।

ভারতের সর্বোদয় নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণের সভাপতিত্বে দিল্লিতে বাংলাদেশের অনুকূলে বিশ্বজনমত গড়ে তোলার জন্য আন্তর্জাতিক সম্মেলনের প্রস্তুতি কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিশ্বের নানা স্থানের ১২০ জনকে আমন্ত্রণ জানানোর সিদ্ধান্ত হয়। বাংলাদেশ সরকারের একটি প্রতিনিধিদল এবং বাংলাদেশের কয়েকজন নেতা এ সম্মেলনে যোগ দেবেন বলে জানানো হয়।

ভারতীয় সংসদের নিম্নকক্ষ লোকসভার সাংসদ ও প্রজা সমাজতন্ত্রী দলের নেতা সমর গুহ কলকাতায় এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, অবিলম্বে বাংলাদেশকে ভারতের স্বীকৃতি দিলে ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে অবাঞ্ছিত যুদ্ধ এড়াতে পারবে এবং বিশ্বের অনেক দেশই তাহলে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবে। এতে বাংলাদেশের মানুষের মনোবল বাড়বে এবং মুক্তিযোদ্ধারা নিজ শক্তিতেই স্বাধীনতা অর্জন করতে পারবেন।

আগরতলায় বাংলাদেশের ফুটবল খেলোয়াড়দের নিয়ে গঠিত শরণার্থী একাদশ দল ত্রিপুরা একাদশের সঙ্গে ফুটবল খেলায় অবতীর্ণ হয়। আসাম রাইফেলস মাঠে অনুষ্ঠিত এ খেলায় বাংলাদেশ ১-২ গোলে হেরে যায়। শরণার্থী একাদশের অধিনায়ক ছিলেন মোহামেডানের কায়কোবাদ। অন্য খেলোয়াড়দের মধ্যে ছিলেন মোহামেডানের আইনুল, ভিক্টোরিয়ার এনায়েত ও নওশের, ওয়াপদার সুভাষ, দিলকুশার নিহার, ফায়ার সার্ভিসের সীতাংশু, চট্টগ্রাম রেলওয়ের বিমল, ওয়ারীর অমল, কুমিল্লা মোহামেডানের তপন ও মন্টু এবং নরসিংদীর মাহমুদ। খেলার টিকিট থেকে প্রাপ্ত অর্থ মুক্তিযুদ্ধের তহবিলে দেওয়া হয়।

মুক্তিবাহিনীর অভিযান

অবরুদ্ধ বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটি বড় দল ফেনী থেকে বেলুনিয়া যাওয়ার পথে শালদাবাজারে সাময়িক অবস্থান নেয়। এ সময় ক্যাপ্টেন জাফর ইমামের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীর একটি ছোট দল পাকিস্তানি সেনাদের ওপর অতর্কিত আক্রমণ চালায়। আক্রমণে পাকিস্তানি বাহিনীর কয়েকজন সেনা হতাহত হয়।

কুমিল্লার কোটেশ্বরে মুক্তিবাহিনীর একটি দল পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে আক্রমণ করে। দু-তিন ঘণ্টা যুদ্ধের পর পাকিস্তানি সেনারা পিছু হটে। তাদের বেশ ক্ষতিও হয়। একজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।

উত্তরাঞ্চলের দিনাজপুরে মেজর নাজমুল হকের নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীর একটি দল পাকিস্তানি বাহিনীর কাঞ্চন সেতু ঘাঁটিতে আক্রমণ করে। দুই ঘণ্টা তুমুল সংঘর্ষের পর মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটে নিজ ঘাঁটিতে ফিরে আসেন। পঞ্চগড়ের আট মাইল উত্তরে অমরখানায় পাকিস্তানি বাহিনীর সীমান্তঘাঁটির ওপর মুক্তিবাহিনী আক্রমণ চালায়। দুই পক্ষে তীব্র যুদ্ধ হয়।

ঠাকুরগাঁওয়ের ১৪ মাইল উত্তর-পশ্চিমে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি ছোট ক্যাম্পের ওপর মুক্তিযোদ্ধারা মর্টারের সাহায্যে আক্রমণ চালান। এ ছাড়া রংপুরের গড্ডিমারীতে মুক্তিবাহিনী ও পাকিস্তানি বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ হয়।

সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর দুই ও সাত; ইত্তেফাক, ৫ ও ৬ জুলাই ১৯৭১; আনন্দবাজার পত্রিকা, ভারত, ৫ ও ৬ জুলাই ১৯৭১।

গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান