মুক্তিযুদ্ধের দিনলিপি
ধর্ম ও অখণ্ডতার নামে বিরোধিতা
মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পেছনে ছিল দেশ-বিদেশের বহু মানুষের একক ও মিলিত চেষ্টা, অজস্র ঘটনা। এখানে রইল একাত্তরের প্রতিটি দিনের বিবরণ।
ভাসানী ন্যাপের (ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি) প্রধান মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ২২ এপ্রিল এক বিবৃতিতে বলেন, পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক জান্তার অনুগত কতিপয় স্বার্থপর ব্যক্তি ধর্ম ও অখণ্ডতার নামে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করছে। বাঙালির বিজয় অনিবার্য।
ভাসানী বলেন, ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবকে অবজ্ঞা করে ২৩ বছর ধরে পাকিস্তানিরা পূর্ব বাংলাকে তাদের উপনিবেশ করে রেখেছে। এই সংগ্রাম হারিয়ে যাওয়া স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের লড়াই। বাংলাদেশের স্বাধীন সরকারকে অবিলম্বে স্বীকৃতি দিতে বিশ্বের সব শান্তিপ্রত্যাশী রাষ্ট্রের সরকার ও জনগণকে তিনি আহ্বান জানান।
আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা দিন: অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী উইলিয়াম ম্যাকম্যাহোন ২২ এপ্রিল ক্যানবেরায় বলেন, বাংলাদেশে জীবনহানির জন্য তাঁরা বেদনার্ত। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের উদ্দেশে তিনি বলেন, আর যেন কোনো জীবনহানি না হয় এবং পাকিস্তানের সংসদে জনগণের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য আওয়ামী লীগের নেতাদের পূর্ণ ক্ষমতা দেওয়া হোক।
বাঙালি বুদ্ধিজীবী হত্যার প্রতিবাদে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে ১০টি দেশের বুদ্ধিজীবীদের উত্থাপিত সম্মিলিত অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অন দ্য ইউনিভার্সিটি ইমারজেন্সি (আইসিইউই) সংগঠনের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। অভিযোগে বলা হয়, রক্তাক্ত গণহত্যায় বিদ্যাচর্চাকারীদের জীবন ও মন তছনছ হয়ে গেছে। তাদের সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্যও ধ্বংস হয়ে যাওয়ার হুমকিতে পড়েছে। তাঁরা বলেন, ‘এই অবস্থায় আমরা চুপ করে থাকতে পারি না।’
বাংলাদেশের ভেতরে
ঢাকায় কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটির আহ্বায়ক খাজা খয়রুদ্দিন মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধ ও পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সহযোগিতা করতে সবার প্রতি আহ্বান জানান।
চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও কুমিল্লা—তিন দিক থেকে পাকিস্তানি বাহিনী এই দিন একযোগে ফেনী আক্রমণ করে। তিনটি আক্রমণই মুক্তিযোদ্ধারা প্রতিরোধ করেন। পাকিস্তানি বাহিনী ফেনী দখল করতে ব্যর্থ হয়।
উত্তরাঞ্চলের হিলিতে পাকিস্তানি বাহিনী আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে সীমান্তরেখার ভেতরে আশ্রয় নেওয়া মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর হামলা করে। ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের সহায়তায় মুক্তিযোদ্ধারা সে আক্রমণ প্রতিহত করেন।
এ রকম দু–একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা ছাড়া পাকিস্তান সেনাবাহিনী ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছিল।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোদাগাড়ীতে বিরাট কনভয় নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরক্ষাব্যূহে পাকিস্তানি বাহিনী হামলা চালায়। এই যুদ্ধে অনেক মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।
নগরবাড়ী ঘাট হয়ে বাঘাবাড়ীতে এসে পাকিস্তানি সেনারা শাহজাদপুর লক্ষ্য করে গোলাবর্ষণ করে। মুক্তিযোদ্বারা প্রতিরোধের চেষ্টা করে বিফল হন। বাঘাবাড়ী ও শাহজাদপুরের পতন ঘটে।
এই দিন বগুড়া শহরেরও পতন হয়। পাকিস্তানি বাহিনী বিনা বাধায় বগুড়ায় প্রবেশ করে।
রাজশাহী থেকে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি বড় দল নওগাঁয় ঢোকে। তাদের গুলিতে বেশ কয়েকজন হতাহত হন। রাতে এখানে শান্তি কমিটি গঠন করা হয়।
মাদারীপুর শহরে পাকিস্তানি বাহিনী হেলিকপ্টার থেকে বোমাবর্ষণ করে। আক্রমণের লক্ষ্য ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের সংগ্রাম কমিটির কন্ট্রোল রুম মিলন সিনেমা হল। কেউ নিহত না হলেও বহু মানুষ আহত হয়।
ময়মনসিংহের মধুপুরে পাকিস্তানি বাহিনীর ব্যাপক বোমাবর্ষণে মুক্তিযোদ্ধারা হালুয়াঘাটে পিছু হটেন।
সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: দলিলপত্র, দ্বিতীয় ও ত্রয়োদশ খণ্ড; বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর এক, দুই, সাত ও এগারো; দৈনিক পাকিস্তান, ২৩ এপ্রিল ১৯৭১
গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান
Also Read
-
সেরে ওঠার পরও থেকে যাচ্ছে নানা শারীরিক সমস্যা
-
গণপরিবহন ২৯ এপ্রিল থেকে চালু করতে চান মালিকেরা
-
ছোট মেয়ে পরপারে, নবদম্পতি আইসিইউতে
-
হামলার আগে মাইকিং করে লোকজন জড়ো করেন আশরাফ
-
লকডাউনে বন্ধ আন্তর্জাতিক ফ্লাইট ও প্রবাসীর পত্র